Bangla Choti বাংলা চটি

Bangla Choti বাংলা চটি banglachoti

বৌদি

< dir=”ltr” trbidi=”on”>প্রথম পর্ব
যে দিনটি দিয়ে আমার গল্পের সূচনা করছি, সেটি ছিল আমার মেজদার ফুলশয্যার রাতের পরের দিন | দুপুর বেলা বড় বৌদি আর বাড়ির সব ভাইবোনেরা মিলিয়ে মেজদার ঘরে রীতিমতো হামলা করছি | আড্ডা, হাসাহাসি, নব দম্পতিকে ঘিরে নানান রসাত্মক ইঙ্গিত – সব কিছুই সমানে চলছে | মেজদা মিটিমিটি হাসছে আর নতুন বৌদি লাজুক মুখে নতুন শাড়ি পড়ে সেজেগুজে খাটে বসে আছে |
নতুন বৌদির গায়ের রং শ্যামলা | গায়ের রং কালো বলেজেঠিমার বেশ দুঃখ, আমার মায়ের যদিও ভীষণ পছন্দ হয়েছিল ওকে | বাবা, জেঠু – ওদেরও খুব ভালো লেগেছিলো | আমি যখন নতুন বৌদিকে প্রথম দেখলাম, তখন প্রথম যে কথাটা মনে হয়েছিল সেটি হলো – “ তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিন চোখ ” | অদ্ভুত সুন্দরী, লাবন্যে ভরা চেহারাটি, তার চেয়েও সুন্দর ওর চোখের ভাষা | আমার তো একেবারে love at first sight | মেজদার কি হয়েছিল তা মেজদাই জানে |
আমাদের বাড়িতে দাদাদিদিদের ডাকগুলি জেঠুর পরিবার মিলিয়েই হয় | জেঠুর, বাবার – দু জনেরই দুই ছেলে এক মেয়ে – বড়দা, মেজদা আর দিদি জেঠুর ছেলেমেয়ে আর ছোড়দা, আমি, আমার বোন – এরা বাবার ছেলেমেয়ে | ভীষণ জমজমাট ব্যাপার হয় সবাই একত্র হলে |মেজদা দেশের সেরা কারিগরী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির একটি থেকে এবং তারপর দেশের সেরা ম্যানেজমেন্ট স্কুল থেকে পাশ করা ছাত্র ছিল | বিয়ের সময়তেই মেজদা সুপ্রতিষ্ঠিত, মুম্বাই (বম্বেই বলি, তখন শহরের নাম ছিল তাই )এর অদূরে থানে তে নিজে ফ্ল্যাট কিনে বসেছে | মেজদার বয়স তখন ২৯ বছর | নতুন বৌদি তখনো এম এ পরীক্ষাদেয়নি, ওর বয়স ২২ এর বেশি নিশ্চয় নয় | আমি সবেমাত্র ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি, বয়স ১৮ ও হয়নি |
আমাদের সেদিনের আড্ডাতেই ফিরে আসি | অন্ত্যাক্ষরী খেলা চলছে নতুন বৌদিকে নিয়ে| গানের সুরেলা গলার আভাস পেয়েই আর আমি ছাড়লামনা | আগেই জানতাম যে কলকাতার বড় গানের স্কুল থেকে বৌদি গান শিখেছে | অনুরোধ করলেই কি নতুন বউ সঙ্গে সঙ্গে গান গাইবে নাকি ? আমি দিদির তানপুরাটা সোজা ওর হাতে এনে দিলাম |
– “ এ কি ? এ বাবা ! ” নতুন বৌদি ভীষণ লজ্জা পেয়ে বললো |
– “ মেজদার জন্য একটা গান করো তো ”
– “ না, প্লিজ – সবাই গান করুক ”
– “ রূপে তোমায় ভোলাবোনা, ভালোবাসায় ভোলাবো | যদি কালকে রাতেই শুনিয়ে না থেকে থাকো- ”
শেষমেষ চাপে পড়ে গাইতেই হলো নতুন বৌদিকে | ওর অপূর্ব গায়কী শুনে বললাম “ তুমি তো গান গেয়ে দ্বার খুলিয়েই দিয়েছ ” | তারপর আরো কত গান গাইলো বৌদি | দিদিকে, তারপর বোনকেও ছাড়া হলনা |
ভয় পাচ্ছিলাম তীরটা কখন আমার দিকে ছোড়া হয় | আমার বোনটাই সব মাটি করলো | আমি আর সাহস করে নতুন বৌদির সামনে রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইনি | বললাম “ মেজদার হয়ে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় এর লেখা মান্না দে ’ র একটা গান করি ”
“ হৃদয়ের গান শিখে তো গায় গো সবাই
কজন আর হৃদয় দিয়ে গাইতে জানে?
নয়নে কাজল, সে তো সবাই পরে
কজন আর তোমার মতন চাইতে জানে? ”
নতুন বৌদি লাজুক মুখে মাথা নিচু করে গানটা উপভোগ করেছিলো | বললো “ ভীষণ, ভীষণ ভালো | আরো গান গাও ছোট ঠাকুরপো ”
সেই দুপুরেই আমার সাথে নতুন বৌদির প্রথম পরিচয় | অল্প কয়দিন ওরা কলকাতায় ছিল বম্বে যাবার আগে | একদিন সব ভাইবোনরা মিলে রেস্টুরেন্ট গেছি, একদিন সিনেমা গেছি – এইটুকুই পেরেছি | নতুন বৌদি বলে গিয়েছিলো “ বম্বে তে এস কিন্তু | ”
আমাদের যাওয়া হয়নি | ওরা বছরে একবার করে এসেছে | একটুহই হুল্লোর হয়েছে, তবে সেও ভীষণ অল্প দিনের জন্য | সামান্য কটা দিনের মধ্যে বৌদিকে দুর্গাপুরেও যেতে হয়েছে নিজের বাবা মা ’ র কাছে|
নতুন বৌদির নামটাই বলিনি এখনো | ওর নাম মল্লিকা | ছোট করে বাড়ির নাম ‘ মলি ’ |

দ্বিতীয় পর্ব 

আরো চার বছর পর যখন পাশ করি, তার কিছুদিন আগেই ক্যাম্পাসইন্টারভিউ এর মাধ্যমে জীবনের প্রথম চাকরিটি পাই | পোস্টিং ব্যাঙ্গালোর, কিন্তু আরম্ভে চার মাসের ট্রেনিং, বম্বেতে | ট্রেনিং হোস্টেলে স্থানাভাব, সেটা আগেই জানিয়ে রেখেছিলো কোম্পানি, ওরা পি জি খুঁজে দেবার চেষ্টা করবে | মেজদা থাকায় আমার এ সবের প্রয়োজন নেই, সেটা জানিয়ে দিলাম | অফিস কান্জুরমার্গের কাছে, থানে থেকে যাতায়াত করতেই পারবো |
মেজদার বিয়ের পর চার বছর কেটে গেছে | ইতিমধ্যে আরো দুতিনবার চাকরি বদল করে মেজদা তখন একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট ক্যাডারে চলে এসেছে | নতুন বৌদি এম এ পাশ করে ঘর গৃহস্থালি করছে | আমিকবে আসবো সেই অপেক্ষায় ওরা দিন গুনছিল | কয়েকদিন পর পর ফোন করে আসবার তারিখ কি ঠিক হলো জিজ্ঞাসা করতো | কোম্পানির থেকে ওদের তাড়া বেশি ছিল |
শেষ অবধি দিনটি চলেই এলো | তখন জুলাই মাস, বোম্বেতে ঘন বর্ষাকাল | বর্ষার মধ্যেই পৌছেছি | সাততলার ওপরে ফ্ল্যাট মেজদার | দুটি শোবার ঘর, লিভিং রুম আর রান্নাঘর | বম্বের পক্ষে যথেষ্টই বড় | আর বাড়ির সৌন্দর্য নির্ভর করে বাড়ি যে সাজাচ্ছে তার রুচির উপরে| এ ব্যাপারে নতুন বৌদির জুড়ি নেই | সোফার কভার, পর্দা, wall hanging – সব কিছুতেই ওর পছন্দে সংসার সেজে উঠেছে | অভাব একটি জিনিসের – এমন কেউ, যে দুরন্তপনা করে সাজানো বাড়ি লন্ডভন্ড করে দিতে পারে আর যার পিছনে বৌদিকে সারাদিন দৌড়দৌড়ি করে বেড়াতে হবে | সেঅভাবটা যে বৌদির কাছে কত বড় দুঃখের স্থান ছিল তা কয়দিন পরেই বুঝেছি |
বাড়ির দ্বিতীয় ঘরটা ছিল গেস্টরুম | কলকাতা বা দুর্গাপুর থেকে বাড়ির কেউ এলে ওখানেই থাকতো | এখানে এসে ওটাই হয়ে গেলো “ ছোট ঠাকুরপোর ঘর ” | একটা খাট, একটা আলমারি, একটা টেবিল | আমার ঘরে একটা লেখার টেবিল থাকাটা নিতান্তই জরুরী | টেবিলের পাশের জানালাটা খুলে দিলে ঘরে অফুরন্ত হাওয়া |
কি আরামের জীবন ! সকালে নতুন বৌদি প্লেট ভরে ব্রেকফাস্ট সাজিয়ে দেবে, তারপর অটোতে করে স্টেশন, ৮:০৩ এর লোকাল, ভিড় ঠেলে কান্জুর মার্গ স্টেশনে নামা, কয়েকটা বোরিং লেকচার, প্ল্যান্ট ভিজিট, আবার বিকেল চারটে বাইশ এর লোকাল ধরে ফিরে এসে নতুন বৌদির কাছে চা জলখাবার প্রাপ্তি | মেজদা ফিরত অনেক দেরি করে | ওর অফিস ছিল ওরলিতে, যাতায়াতে সময় লাগতই, এ ছাড়া নতুন চাকরি, দায়িত্ব বিরাট | মোটামুটি ডিনারের অল্প আগে মেজদা ঢুকে যেত | তার আগে নতুন বৌদির সাথেই গল্প হত আর সঙ্গে টি-ভি, ভি-সি-আর দেখা | তখন টি ভি চ্যানেল বলতে দূরদর্শন আর মেট্রো | প্রায়ই নতুন বৌদি আমায় ছাদে পাঠাতো এন্টেনা নড়ে গেছে কিনা দেখতে, কেবল এর যুগ তখনো শুরু হয়নি |
নতুন বৌদির সাথে সখ্যতা হচ্ছিলো বেশ ধীর গতিতে | আমিনতুন বৌদি বলেই ডাকি দেখে একদিন হেসে বলেছিলো, “ এখনো নতুন বৌদি ? পুরনো হয়ে গেলামতো | ” আমিও রসিকতা করতে ছাড়লামনা | বললাম, “ তুমি চিরনূতন ” | এর পর থেকে মাঝে মাঝেই নতুন বৌদিকে ইয়ার্কি মেরে “ চিরনূতন ” বলে ডাকতাম |
সে বয়সে একটু আধটু লিখতাম | তখন কলমের জোরটা আজকের চেয়ে ভালো ছিল, বহুদিনের অনভ্যাসে বাংলা লেখায় মরচে ধরে গেছে এখন | খাওয়ার পর পড়ার টেবিলে বসে কিছু লিখলে নতুন বৌদি ঘরে এসে কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করতো “ প্রেমপত্র লেখা হচ্ছে বুঝি? ” বলতাম, “ অতিরিক্ত কৌতুহল ভালো নয় ” | বলতো, “ এই একবারটিদ্যাখাও না কি লিখছো ? যে এত সুন্দর করে কথা বলে, সে নিশ্চই খুব ভালো লিখতেও পারে ? ” ছুটির দিন, মানে শনি আর রবি, বৌদি বারবার চলে আসতো আমার ঘরে, একটু বিরক্ত করতে | আমি বলতাম, “ তোমার একটাই কাজ, বুঝলে ? দেবরজী কে ঘন্টায় ঘন্টায় চা সরবরাহ করা | আর চা-র সাথে চানাচুর | ” চা টা এলে চুমুকটা দিয়ে একবার বলেছিলাম, “ চিরনূতন, দেখেছো কি মানুষের পছন্দের অনেক ভালো জিনিস এর আদ্যাক্ষরে চ ? ” নতুন বৌদি বলেছিলো, “ কি রকম? ” বললাম, “ এই যেমন চা, চানাচুর | দুপুরে আজকে চিংড়ি মাছ | আর চ দিয়ে অন্য জিনিসগুলি তো আরতুমি চাইলেও দেবেনা ? ”
“ যেমন? ” আবার নতুন বৌদির প্রশ্ন |
“ চুম্বন- ” একটি শব্দেই উত্তরটা দিয়ে দিলাম |
বলবার পরপরই বৌদি আমার কানটা ধরে মুলে দিলো | বললাম, “ চুম্বন অবধিই তো বলেছি | চ দিয়ে আরো চাওয়ার জিনিস এর নাম উল্লেখ না করতেই কানমলা ? ” নতুন বৌদি চড় মারবে বলে প্রস্তুত হচ্ছিলো | “ দ্যাখো চড় এও চ ” |
মধুর চড় চাপড়ের লোভে সাহসটাও বেড়ে চলেছিলো | স্নান করতে ঢুকলে নতুন বৌদির অনেকক্ষণ লাগতো | সারাদিন বাড়িতে নিজের মনে গুনগুন করে গাইলেও ওই সময়টায় নতুন বৌদি বাথরুমে গলা খুলে গাইতো | আমি বাইরে থেকে শুনতাম | একদিন বলেছিলাম, “ দেহের আবরণগুলি খুলে গেলে তোমার গানের গলাটাও খোলে | বাথরুমের বাইরে থেকেও সবটা বুঝতে পারি | ” বলতে না বলতেই লজ্জায় মুখ লাল করে বৌদি আমার কানটা সজোরে মুলেছে | বললো “ এবার কাকিমা (আমার মা) কে বলতে হচ্ছে যে এ ছেলের এক্ষুনি বিয়ে না দিলে বখে যাবে এবং বৌদির সাথে সময় কাটানো একেবারেই নিরাপদ নয়| ”

তৃতীয় পর্ব
নতুন বৌদির সাথে দুষ্টুমিটাচলছিলই | চলছিলো বললে কম করেবলা হয়, দিনের থেকে দিন বেড়েই চলেছিলো | ওকে অনেক নামে ডাকতাম, যখন যেটা ইচ্ছাকরে – “ চিরনূতন ” তো ছিলই, কখনো কখনো স্রেফ নাম ধরে “ মল্লিকা ” বা একেবারে “ মলি ” বলেও ডাকতাম | আর ও আমায় মাঝে মাঝে “ ছোট ঠাকুরপো ” , কখনো বা আমার নিজের নাম, কখনো বা ডাকনাম “ বাবু ” , কখনোবা “ এই দুষ্টুটা ” | ভীষণ মধুর একটা সম্পর্ক, যেটা দিনের থেকে দিন গভীর হচ্ছিলো |
প্রথম মাস প্রায় শেষ হতে চললো | প্রথম মাসের মাইনে পেয়েই কি কি করবো, তা মনে মনেঠিক করে রেখেছিলাম | যেদিন মাইনেটা পাবার কথা, সেদিন সকাল বেলা মেজদা আর বৌদির সাথে ব্রেকফাস্ট করতে করতে বললাম, “ আজ আমরা খুব ভালো কোনো রেস্টুরেন্টে রাত্তিরে খাবো | প্রথম মাইনে পাবো বলে কথা ” মেজদা বললো, “ ও, তাহলে তোর ঘাড়টা খুব ভালো করে ভাঙব আজকে | কোথায় খাওয়াবি বল ? ” নতুন বৌদিকে বললাম, মা ’ র জন্য একটা শাড়ি আর কুঁড়ি (আমার বোন) – র জন্য সালোয়ার সুট কিনবো | ভালো দোকানপাট কোথায় তার খোঁজ করলাম | নতুনবৌদি বললো তাহলে দাদারে যাওয়া যাক | কেনাকাটা ওখানে হবে, খাওয়াটা ওখানেই প্রীতম হোটেলে সেরে নেওয়া যাবে | মেজদা সোজা অফিস থেকে প্রীতমে চলে আসবে |
ডি ’ সুজার হাত থেকে পে প্যাকেটটা নিয়ে এত ভালো লাগছিলো বলার নয় | যেন সাত রাজার ধন এক মাণিক হাতে পেয়েগেছি | মাইনের অঙ্কটা আর নাইবা বললাম | সবাই লজ্জা পাবেন, তবে তখনকার দিনে আমারঅল্পস্বল্প প্রয়োজন মেটানোর পক্ষে ভালই | ট্রেনিংটা মাসের দশ তারিখ থেকে শুরু হয়েছে, তাই মাইনেটাও ছিল ভাঙ্গা মাসের| মোটামুটি যা কেনাকাটার পরিকল্পনা ছিল এবং প্রীতম হোটেলে খাওয়া – এতেই মাইনেটা মনে হয় শেষ করে দিতেপারবো | অল্পস্বল্প কিছু রেখে দেবো ট্রেনের মান্থলি, অটো ভাড়া আর হাত খরচার জন্য|
নতুন বৌদিকে সঙ্গে নিয়েই দোকানে ঢুকেছি | আগে কুঁড়ি ’ রটা কিনলাম , তারপর অন্যদের | সবটাই নতুন বৌদিকে পছন্দ করে দিতে হলো | মা ’ র টা পছন্দমতন কেনা হয়ে যাবার পরই আমারঅন্তরের একটা প্রবল ইচ্ছা নতুন বৌদিকে না বলে পারলামনা | খুব আস্তে আস্তে,দোকানদারকে শুনতে না দিয়ে ওকে বললাম,
“ ও নতুন বৌদি, লিপি ’ র জন্য একটা শাড়ি পছন্দ করে দেবে ? ”
নতুন বৌদি একেবারে আকাশ থেকে পড়ল – “ লিপি ? সে আবার কে? ”
খুব লাজুক মুখে বললাম, “ someone so special to me ”
“ আচ্ছা, so sweet, so interesting! ” নতুন বৌদি তো আহ্লাদে আটখানা |
“ মেজদাকে বলোনা, প্লিজ | শুধু তোমাকে বললাম | ”
“ আচ্ছা রে বাবা আচ্ছা | কিন্তু, তোমার স্পেশাল এর কিপছন্দ, সেটা আমি কেমন করে বুঝি ? ”
“ যেটা তুমি পছন্দ করে দেবে, আমি কিনে ওর হাতে দেবো | আমি জানি, আমি যা দেবো, ওর ভীষণ পছন্দ হবে | ”
“ কিরকম দ্যাখাতে বলবো বলো? range ? ”
“ ভালই | পিওর সিল্কে দ্যাখাতে বলো ”
নতুন বৌদি জিজ্ঞাসা করে নিলো,
“ কি রং নেবো ? আচ্ছা, লিপি ’ র গায়ের রং কিরকম? ”
“ কালো ” আমি বললাম |
“ কালো? ” ওর প্রশ্নটার উত্তর তৈরী ছিল |
“ তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিন চোখ ”
“ বাহ, বাহ, প্রেয়সীর কথায় রবি ঠাকুরের কাব্য মনে হচ্ছে ? কিন্তু, বাছাধন, তুমিও কিনা সেই ঘুরে ফিরে মেজদার মতন কালো মেয়ের পাল্লায় পড়লে ? মেজদা কে না হয় খুঁজে পেতে কালো মেয়ে এনেদেওয়া হয়েছে, আর তুমি কিনা স্বেচ্ছায় ? ”
“ মল্লিকার পাশাপাশি লিপিকা – বেমানান হবেনা বলো ? ”
দোকানদার অধৈর্য হচ্ছে | আমার লিপিকা ’ র জন্য নতুন বৌদিকেই খুঁজে খুঁজে একটা খুব সুন্দর পিওর সিল্কের প্রিন্টেড শাড়ি পছন্দ করতে হলো |
“ লিপি কে বেশ মানাবে বলো নতুন বৌদি ? ”
নতুন বৌদি আমার হ্যাংলামো দেখে আর বাঁচেনা |
“ আমি কি করে বলি তোমার লিপি ’ কে সব চেয়ে বেশি কোনটায় ভালোলাগবে ? ”
“ তুমি একটু গায়ে ফেলে দ্যাখাও ”
দোকানদার সাগ্রহে নতুন বৌদি ’ র গায়ে শাড়িটা লাগিয়ে বললো, “ ইয়ে দেখো শেঠ, কিতনা বরিয়া লাগেগী ”
প্রথম মাসের মাইনে পেয়েই (তায় আবার ভাঙ্গা মাসের !) আমি বনে গেলাম শেঠ ? বেদম হাসি পেলো আর গর্বিত হয়ে লিপি ’ র জন্য কিনেই ফেললাম শাড়িটা|
শাড়ির দোকান থেকে রাস্তায় বেরিয়ে লজ্জা সরমের মাথা খেয়েই নতুন বৌদিকে বললাম, “ একটা ম্যাচিং শায়া ব্লাউজ কিনিয়ে দেবে ? ”
“ আচ্ছা বিপদে ফেল্লে আমায় ? আমি না জানি ও কতটা লম্বা, নাজানি ওর গায়ের মাপ- ”
“ ওই পাঁচ ফুট চার মতন উচ্চতা, আর গায়ের মাপটা, হু, বলা মুশকিল কারণ এখনো মেপে দেখিনি | ”
নতুন বৌদি ফিক ফিক করে হাসছে| বললো, “ থাক, গায়ের মাপ নিয়ে রিসার্চটা পরে করো | বাচ্চা মেয়ে তো, আমার চেয়ে কম হবারই কথা ”
“ না না, বোধ হয় তোমারি মতন হবে | ”
“ থার্টি সিক্স কিনবো ? ঠিক তো ? তোমার কপালে অশেষ দুর্গতি আছে দেবরজী | ”

আবারও সাবধান করে দিলাম, “ বলবেনা কিন্তু কাউকে | লিপি ’ র কথা শুধু তোমাকে বললাম | খুব গোপন | দাঁড়াও, তোমায় ঘুষ দিয়ে রাখি একটু, যাতে গোপনীয়তা বজায় থাকে | পাশের দোকানে ঢুকেই নতুন বৌদির হাতে ধরিয়ে দিলাম একটা বড় বাক্সো চকলেট | মা ’ র জন্য শাড়ি কিনলাম, কিন্তু জেঠির জন্য কিনলামনা, মনটা খারাপ লাগছিলো | প্রথম মাসে কতটাই বা হয় ?
আমরা ঘুরছিলাম দাদর টি টি ’ র কাছে | কোনো এক যুগে বোম্বেতে ট্রাম চলতো, তখন জায়গাটা ছিল ট্রাম টার্মিনাস, সংক্ষেপে টি টি |নামটা এখনো রয়ে গেছে | জায়গাটা আমি আর নতুন বৌদি ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম | সময় কাটানোর জন্য একটু পানিপুরিখেলাম | প্রীতমে আসতেই মেজদার গাড়িটাও এলো | দারুন রেস্তরেন্ট, বুঝলাম গলাটা পুরো কেটে ফাঁক হয়ে যাবে, সে যাক | মেজদার সাথে ঢুকে, সাজানো টেবিলের সামনে বসে মেনু কার্ড নিয়ে মেজাজে অর্ডার করলাম | Fried prawn, রেশমী কাবাব, রুমালি রোটি, মাটন দো-পিয়ান্জা, বাটার চিকেন – কোনো কিছুই বোধ হয় বাদ দিইনি | আজ আমি কিনা শেঠ! নতুন বৌদি বসেছিলো মেজদার পাশে, আমি উল্টো দিকে | গায়ে সবুজ সিল্কের শাড়ি, গলায় মুক্তর মালা, কানে মুক্তর ঝোলা দুল, হাতে মুক্তর বালা| আমিই পরতে বলেছিলাম| মেজদাএকবার নাকি এনে দিয়েছিলো হায়দ্রাবাদ থেকে, এতদিন তোলা ছিল বাক্সে | ভীষণ সুন্দর লাগছিলো নতুন বৌদিকে|আজ সব ভাইবোনেরা একসাথে থাকলে কতই না ভালো হত | সব চেয়ে বেশি miss করছিলাম কুঁড়িকে | ছোড়দা বসে আছে আমেরিকার ইঠাকায়, তখন ও কর্নেলে পি-এইচ-ডি করে | আর বড়দা, বড় বৌদি ইউরোপে, দিদি ইন্দোরে | সব কেমন ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাচ্ছি, যে যার মতন |
নতুন বৌদি মেজদাকে কেনাকাটার জিনিসগুলি না দেখিয়ে আর থাকতেই পারছেনা | মেজদা দেখতে দেখতে বলতে লাগলো, “ ও, এটা কাকিমার, এটা কুঁড়ির ? কি সুন্দর | ” আমি নতুন বৌদি ’ র দিকে তাকিয়ে ইশারা করছিলাম, যাতে পরের প্যাকেটটা না খুলে ফেলে | আস্তে আস্তে বললো, “ ভয় নেই| ” মেজদা শুনতে পেয়েছে | বললো, “ কি বলছো বলত ? ” নতুন বৌদি হেসে ম্যানেজ দিলো, “ দেওর বৌদি ’ র কথায় আড়ি পাততে নেই| ”
রাত প্রায় দশটা হয়ে গেলো প্রীতম থেকে বেরোতে | তারপর থানে অবধি ফেরা | বিলটা মেটানোর সময় মেজদা জিজ্ঞাসা করলো, “ বাবু, তোর পকেটটা ফাঁক হয়ে গেলনা ? ” বললাম, “ হলেই বা ! বাকি মাস কেয়ার অফ মেজদা | ” বললো, “ ঠিকহ্যায় ভাইয়া | ভালো বলেছিস| মেজদা হ্যায় না | ”
মেজদা অফিসের ড্রাইভারকে ছুটি দিয়ে দিয়েছিলো রাত হবে বলে | নিজেই ড্রাইভ করছিলো সায়ান, ধারাভী, ইস্টার্ন এক্সপ্রেস হাইওয়ে দিয়ে | নতুন বৌদি বসেছে মেজদা ’ র পাশে | আমি পিছনের সিট এ বসে পাচ্ছিলাম নতুন বৌদির পারফিউমের মিষ্টি গন্ধটা | ওকে দেখতে পাচ্ছিলাম জানালার পাশে সাইডের আয়নাটাদিয়ে | বাতাসে ওর চুলটা উড়ছিল, হাত দিয়ে ঠিক করে নিচ্ছিল বারবার | আয়নার কাঁচে নতুন বৌদি ’ র চেহারার উপরে লেখা ছিল “ objects are closer than what they appear at the mirror”
ভীষণ ভালো লাগছিলো নতুন বৌদিকে মেজদার পাশে | মেজদা ’ র স্বপ্ন হলো সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে যাওয়া, আর নতুন বৌদি ’ র চাওয়া সামান্যই, একটু মেজদাকে কাছে পাওয়া | এই দুটির সমন্বয় হতে পারছিলনা | আজ আবার একটু বেশি সময় কাছে পেয়ে নতুন বৌদি ’ র ভালো লাগছেনিশ্চই |
আমারও খুব আনন্দ চলছে মনের ভিতরে | আজ শেঠ হয়ে গেছি না ? শ্রাবনের মেঘেঢাকা আকাশ | বৃষ্টি পড়ছিল ঠিক ইল্শেগুরির মতন |ভীষণ ভালো লাগছে, তাই আমি গুনগুন করে গাইছিলাম, “ হৃদয় আমার নাচে রে আজিকে ময়ুরের মতো নাচে রে ” |
“ গলা খুলে গাও না, ছোট ঠাকুরপো ? ”
“ তুমিও সঙ্গে গাও, মেজদাও গাইবে – ”
চড়া স্কেলে ধরেছিলাম,
“ শত বরণের ভাব-উচ্ছাস, কলাপের মতো করেছে বিকাশ,
আকুল পরান আকাশে চাহিয়া, উল্লাসে করে যাচে রে ”
মেজদাকে ওয়াইপার চালিয়েই দিতে হলো | বম্বের বর্ষা, কখন যে ইল্শেগুরির থেকে উন্মত্ততা পাবে, তা ভগবানই জানেন | স্টিয়ারিংটা ধরে রেখেই ও আমাদের সাথে গলা মেলালো –
“ ওগো নির্জনে বকুল শাখায়, দোলায় কে আজি দুলিছে, দোদুল দুলিছে ”
গাড়ির দুলুনির সাথে দুলতে দুলতে গাইছিলাম – কি মনমাতানো সুর ওই গানটার | কিজোর বৃষ্টি এসে গেলো নিমেষের মধ্যে, ঠিক এটাই আমিচাইছিলাম ! মেজদা গাড়ির গতি কমিয়ে দিলো | জানালার কাঁচের ফাঁক দিয়ে নতুন বৌদি ’ র গায়ে ছাট লাগছে | ওর ভিজতে ভালো লাগছে | বৃষ্টির বেগের সাথে আমাদের গান আরো এগিয়ে গেছে,
“ ঝরে ঘনধারা নবপল্লবে কাঁপিছে কানন ঝিল্লির রবে
তীর ছাপি নদী কলকল্লোলে এলো পল্লীর কাছে রে ”
নতুন বৌদি মেজদাকে বলছিলো, “ একবার গাড়ি চালিয়ে আমাদের পাহাড়ে নিয়ে যেওনা একটু- ভীষণ ইচ্ছা করে | কতদিন বেরইনি ” |
বাড়ি ফিরতে রাত হলো | গল্প করে সময় নষ্ট করলামনা | রাতটুকু ওদের দুজনার জন্য ছেড়ে দিতে ইচ্ছা করলো | আমি চাইলাম, আজ রাতে ওদের ভালোবাসা নিবিড় হোক, নতুন বৌদি ’ র ঘরে ফুল ফুটুক, ওর সব দুঃখ ভুলিয়ে | মেজদার ঘরের আলোটা নিভে গেছে | আমি চুপি চুপি আমার ঘরে আলোটা জ্বালিয়ে প্যাকেট থেকে লিপির শাড়িটা বার করে হাত বুলালাম | লিপি আমার, তাকে আমি বিনা বাধায় আদর করে যেতেপারি |
বর্ষণধারা তখনো অবিরাম চলেছে | মনে হচ্ছিলো লিপি তানপুরাটা হাতে নিয়ে শুধু আমায় শুনিয়ে চলেছে,
“ আজি তোমায় আবার চাই শুনাবারে
যে কথা শুনায়েছি বারে বারে ”
আমার মনের নিভৃত গোপন কোনে সে গান শুনতে শুনতে লিপি ’ র গায়েই মাথা এলিয়ে কখন যেন ঘুমিয়ে পরেছি |

চতুর্থ পর্ব
কি বিপদটাই না ঘটালাম| নতুন বৌদি ’ র হাতে আমার পিছনে লাগবার একটা মোক্ষম অস্ত্র তুলে দিলাম ? তা ছাড়া উপায়টাই বা কি ছিল ? নিজের পছন্দর উপরে আস্থা রেখে লিপি ’ র জন্য শাড়ি কিনবো, সেটা পারবনা | নতুন বৌদি ’ র সাহায্য ছাড়া সেটা হওয়া সম্ভব ছিলনা |
ও বারবার জানতে চাইতো লিপির ব্যাপারে | আমি একটু এড়িয়ে চলতাম প্রসঙ্গটা | জানতো আমার পেটের থেকে সহজে কথা বেরবেনা, তাই অনেক কায়দা কানুন করতো কথা বার করতে | এমনকি ব্ল্যাক মেলও করতো, “ মেজদাকে বলে দেবো, যদি আমাকেও না বলো | ” আবার চকলেট দেবো ইত্যাদি প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিরস্ত করতাম |
একটা ছুটির দিনে ঘুম থেকে উঠে বালিশের পাশে একটা ছোট্ট চিরকুট পেলাম | লেখা আছে, “ মনে হয় লিপিকে প্রেমপত্র লিখে অনেক রাত করে ঘুমিয়েছো | তাই জাগালামনা | ব্রেকফাস্ট তৈরী আছে, মুখটা ধুয়ে খেয়ে নাও | ” মুখটা ধোবার আগে চিরকুটের পিছন দিকে লিখে দিলাম, “ নিদ্রামগ্ন পুরুষ মানুষের ঘরে বিনা অনুমতিতে প্রবেশের অধিকার তোমায় কে দিলো ? ” চিরকুট খানি সাবধানে গুঁজে রাখলাম নতুন বৌদি যে বইটা তখন দুপুরে বসেপরতো, সেই পেজ মার্ক এরই ভিতর করে | পরদিন আবার সেই চিরকুটে লেখা, “ আবার যদি দেরি করে ওঠ, কাতুকুতু দেবো| ” লিখে দিলাম, “ ঘোরতর বিপদ হতে পারে কাতুকুতু দিলে | নিজেকে বাঁচাতে গিয়ে আমার হাতটা তোমাকে কোথায় অসাবধানে স্পর্শ করে ফেলবে, তখন আমায় দোষ দিওনা যেন | আমি বলে দেবো, আত্মরক্ষায় করেছি | ”
বেশ জমত এই খেলাটা | আজকালকার লোক হলে এস-এম-এস এখেলাটা খেলতে পারতাম, তখন এবং আমাদের বহু আগের যুগেও দেওর-বৌদি ’ র এহেন খেলাগুলি হত চিরকুটের মাধ্যমে | খেলতে বাধা কোথায় ? নতুন বৌদি আমার খেলার সাথী তো বটেই | আর সেই সঙ্গে আমার বন্ধু, আমার দোসর, কখনো বা অভিভাবিকা, যেন সাক্ষাত মা জননী |
আমি কি জানতাম, এই মা জননী প্রসঙ্গে একদিন নতুন বৌদি ’ র প্রাণে অজান্তে ব্যথা দিয়ে ফেলবো ? রাতে খুব বৃষ্টি চলছিলো, ঘরে ফ্যান চলছে, জানালা দিয়ে বাদলের পাগলা হাওয়া আসছে | আরাম করে ঘুমিয়ে আছি | সকালে দেখি, আমার গায়ে একটা পাতলা চাদর, ফ্যানটা অনেক কম করে চালানো| বললাম, “ আজকাল দিব্যি রাতের বেলাতেও বিনা অনুমতিতে ঘরে এসে পর ? ”
ও একটু সিরিয়াস ছিল কেন জানি| আমি বললাম, “ একেবারে সাক্ষাত মা জননীর মতো গায়ে সযত্নে চাদর গায়ে দিয়ে দিয়েছে ? ”
“ ঠান্ডা লেগে গেলে তো ফ্যাঁচফঁচ করবে | ”
আমি সকাল সকাল বেদম দুষ্টুমি ’ র মুড এ ছিলাম | বলেই দিলাম, “ আমার তৃষ্ণার্ত ঠোঁটে একটা বিশেষস্থানের স্পর্শ না দিয়েই মা জননী হলে ? ”
নতুন বৌদি উত্তর করেনি | কি ব্যাপার ? আমার রসিকতার মাত্রা ছাড়ানোয় ও রাগ করেছে? এ তো হবার কথা নয় ? কানমলা, চড় চাপড়, গাট্টা – এগুলি খাবারই কথা ছিল | আমি কাছে গেলাম | ওর চোখে জল, গম্ভীর হয়ে নিজের কাজ করে চলেছে | বললাম, “ রাগ করলে ? ” আমার কোনো কথার উত্তর করলনা | আমিকাছে ডাকতে ও হাউ হাউ করে কেঁদে ফেললো | “ মা জননী আমি হতে পারিনি | ও কথা ভাবলেই আমার ভীষণ কষ্ট হয়, ছোট ঠাকুরপো | কিন্তু তোমার মুখেও সেই এক কথা ? যখনি কলকাতায় যাবো, সে একদিনের জন্য হলেও তোমার জেঠি, দিদি, আমার মাসী শ্বাশুড়ি – সব এক কথা বলে যাবে, কবে ছেলেপুলে হবে, এখনো কেন হলনা ? আমার সাথে আর কি কোনো কথা নেই কারোর | আমি এখনো মা হতে পারিনি দেখে আমার নিজের মনের ভিতরে বুঝি কোনো কষ্ট নেই ? সবাই তো জানে ডাক্তার দ্যাখানো হয়েছে ”
বুঝলাম, নতুন বৌদি আমার পুরোকথাটা শোনেনি, বা যে কোনো কারণেই হোক বোঝেনি | আমার কথার ও পুরো অন্য রকমের একটামানে করেছে | নতুন বৌদির মনেকিরকম কষ্ট, আমি বুঝতে পারলামনা | আস্তে করে ওকে পাশে বসিয়ে বললাম, “ তুমি আমার কথা বোঝনি নতুন বৌদি, আমি সে কথা বলিইনি | যতখুশি কানমলা দাও, কিন্তু তোমার সাথে দুষ্টুমি আর ইয়ার্কি না করে আমি থাকতেই পারবনা, নতুন বৌদি ” | ও আমার কাঁধের উপরে মাথা রেখে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে থাকলো, “ আমার মনে অন্য কিছু আসেনা, বিশ্বাস করো | আমি চলে যাবো, দেখো, একদিন ঠিক চলে যাবো, তোমার মেজদা তখন যেন নতুন করে সংসার করে | ” ও কেঁদে চলেছে আর আমি ওর পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছি | যেন ও ছোট বাচ্চা | ছোটবেলায় মা ’ র কাছেবকুনি খেলে কুঁড়ি যেমন ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতো | নতুন বৌদির কষ্টে আমার দু চোখ দিয়ে অজান্তেই জল গড়িয়ে পড়ল | সেটা ওকে টের পেতে না দিয়ে বললাম “ ভরসা রাখো নতুন বৌদি | তুমি সব পাবে | আজকের দিনে চিকিত্সা কত এগিয়েছে, কত অসম্ভব আজ সম্ভব হয় | আর চিকিত্সা হেরে গেলেই বা ? এ পৃথিবীতে অনেক শিশু আছে, যারা মায়ের জন্য অপেক্ষা করে আছে | আর যেই তোমাকে যত কষ্ট দিক না কেন, আমি কি তোমায় কখনো কষ্ট দিতে পারবো? আমি তোমার বন্ধু না, তুমি বলো ? লক্ষী আমার, আর কাঁদবেনা বলো ”

পঞ্চম পর্ব
একটি একটি করে দিন এগিয়ে চলেছে | জুলাই এর শেষ দিন, যেদিন আনন্দে বিভোর হয়ে আমরা সবাই গাইছিলাম, “ হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে ” , সে তো পেরিয়েই এসেছি | অগাস্ট মাসের শেষার্ধ ও দেখতে দেখতে চলে এলো | একটা দিন এগিয়ে যাওয়া, মানে একটা করে দিন ফুরিয়েও আসা | যখন ওই সুরটা আস্তে আস্তে মনের মধ্যে ঘুরতে শুরু করলো, “ নাইনাই নাই যে বাকি সময় আমার ” , মনে হচ্ছিলো ঠেলা দিয়ে ফিরে যাবার দিনটিকে সরিয়ে রাখি | কিন্তু সূর্যের চারপাশে পৃথিবী ঘুরবে, নিজের অক্ষরেখা ধরেও আবার পাঁক খাবেই, দিন এগোবেই | সবই তো প্রকৃতির নিয়মেই ঘটে যায়, আমরা কেউ তাকে বাধা দিতে পারবনা |
বাংলা মাসের হিসাবে শ্রাবন মাস সবে শেষ হয়ে গেছে, তবু বর্ষার বিরাম নেই | সকালে খবরের কাগজে বর্ষণের মোট হিসাবটা আগ্রহ সহকারে পড়তাম| যখন এসেছিলাম, তখন স্কোর বোর্ডে দেখতাম তিনশো | ধাপে ধাপে, কখনো বা লাফিয়ে লাফিয়ে, স্কোর পেরোলো পাঁচশো, হাজার, দেড় হাজার, দুহাজার – এবং still going strong !
মেজদা কাজের মধ্যে ডুবে গেছে | কোম্পানি নয়ডায় নতুন ইউনিট খুলছে তখন, তাই দিল্লিযেতে হচ্ছে বারবার | একটা বিরাট কন্ট্রাক্ট নাকি আসতেচলেছে ওদের | বোম্বেতে অগাস্ট মাসে বেশ কয়েকটা ছুটি পড়ে | স্বাধীনতা দিবস ছাড়াও জন্মাষ্টমী, মুম্বাইবাসীর অতি প্রিয় গণপতি, আরো একটা দুটো কি আমি হয়তো miss করে যাচ্ছি | আর ছুটি মানেই তো সারাটা দিন নতুন বৌদি | গল্প, গান, চা, VCR এ ছবি দেখা, এটা ওটা খাবার বানিয়ে দেবার অর্ডার – এইই চলতো | আর মেজদা নেই, তাই খাবার পরেও ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা চলতো দেওর-বৌদিতে মিলে |
সেদিন রাতে শুতে এসে দেখি বৃষ্টি হয়েই চলেছে | মনে হচ্ছিলো, “ আমার প্রিয়ার ছায়া, আকাশে আজ ভাসে | ” ইচ্ছাকরছিলো, লিপি ’ র সাথে দেখা হলে ওকে ওই গানটা শোনাবো, “ এমন দিনে তারে বলা যায় ” | কিন্তু আমি যে গানটার সুর ভালো করে জানিনা, প্রথম দিকটা করতে পারবো, কিন্তু নাশিখলে সুরে এদিক ওদিক বিচ্যুতি ঘটবে | আমায় কে শেখাবে গানটা ?
“ নতুন বৌদি, এসোনা একটু ”
“ কি চাই ছোট ঠাকুরপো ? ”
“ একটা গান শিখিয়ে দেবে ? ”
“ এই মেরেছে, এই মাঝ রাত্তিরে? লোক জন ঘুমিয়ে পড়েছে যে | এখন গান শুনলে সবাই ধরে পেটাবে | কাল হবে ’ খন | ”
“ না না নতুন বৌদি, এখনি | খুব আস্তে আস্তে গাও, আমি তুলে নেবো তোমার সাথে সাথে | ”
“ কোন গান ? ”
“ এমন দিনে তারে বলা যায় ”
“ গাও ”
“ আগে তোমার কাছ থেকে পুরোটা শুনবো | ”
“ শোনো তাহলে, খুব ধীরে গাইতেহয় –
এমন দিনে তারে বলা যায়
এমন ঘন ঘোর বরিষায়
এমন দিনে মন খোলা যায়
এমন মনস্বরে বাদল ঝরঝরে
তপনহীন ঘন তমসায় ||
গানটা তুলবো কেমন করে? আমি তো ডুবে গিয়েছিলাম সুরে, বাণীতে | পুরো গানটা হয়ে গেলে নতুন বৌদি বললো, “ এবার আমার সঙ্গে সঙ্গে গাও ” বলে আবার আরম্ভ করলো গানটা | প্রথম ছত্র তুলিয়ে দিয়ে আমায় বললো পরেরটার সাথে গলা মেলাতে,
সে কথা শুনিবেনা কেহ আর
নিভৃত নির্জন চারি ধার
দুজনে মুখোমুখি, গভীর দুখে দুখি
আকাশে জল ঝরে অনিবার –
জগতে কেহ যেন নাহি আর ||
“ আবার করো, সে কথা শুনিবেনা কেহ আর থেকে ”
আবার ওর সাথে গেয়ে নিয়ে পরেরজায়গাটা শিখতে লাগলাম,
সমাজ সংসার মিছে সব
মিছে এ জীবনের কলরব |
কেবল আঁখি দিয়ে আঁখির সুধা পিয়ে
হৃদয় দিয়ে হৃদি অনুভব
আঁধারে মিশে গেছে আর সব ||
তাহাতে এ জগতে ক্ষতি কার
নামাতে পারি যদি মনোভার |
শ্রাবন বরিষণে একদা গৃহকোণে
দু কথা বলি যদি কাছে তার
তাহাতে আসে যাবে কিবা কার ||
“ শেষেরটা আর একবার একটু শুনিয়ে দাও না নতুন বৌদি, ”
ব্যাকুল বেগে আজি বহে বায়,
বিজুলি থেকে থেকে চমকায়
যে কথা এ জীবনে রহিয়া গেলো মনে
সে কথা আজি যেন বলা যায়
এমন ঘনঘোর বরিষায় ||
গাইতে গিয়ে গলাটা ধরে আসছিলো |
নতুন বৌদি আবার ফিরে এলো গানের আরম্ভে | তারপর ছেড়ে দিলো | আমাকে একা গাইতে হবে, প্রথম থেকে | আর ত্রুটির সংশোধন করে দেবেন আমার শিক্ষয়িত্রী |
“ হলনা, এটা এরকম করে গাইতে হবে
হৃদয় দিয়ে হৃদি অনুভব (সুরে)
গাও, আবার ”
হৃদয় দিয়ে গাওয়া, সে কি অতই সোজা ?
“ অনুভব (সুরে) – শোনো – অনুভব(সুরে)- ভুল করনা ”
যাবতীয় ত্রুটি সংশোধনের পর্ব শেষ করে বলে, “ এবার পুরোটা গাও, আরম্ভ থেকে ”
বারবার গাওয়া হচ্ছিলো | সেদিন সারাটা রাত ফুরিয়ে গিয়েছিলো শুধু গানে, কথায় আরগল্পে | কেন ফুরালো ?
সারা রাতের বৃষ্টিতে কি অবস্থা বাড়ির সামনে ! থৈ থৈ জল |
“ সাবধানে যেও ছোট ঠাকুরপো | ” এ কথাটা রোজই শুনি | না শোনা অবধি বেরোতেই পারিনা কাজে |

থানে স্টেশনে এলাম | রাতের প্রবল বর্ষণে ট্রেন থেমে গেছে | প্ল্যাটফর্মে গিজগিজকরছে লোক, কখন আবার ট্রেন চলবার announcement হয় সেই অপেক্ষায় | ধুত্তর, নিকুচি করেছে announcement | আমি সটান ফিরে এলাম |
কি মজা ! আজ আমাদের ছুটি রে ভাই, আজ আমাদের ছুটি | অফিস যেতে পারবনা | বাড়ির সামনে জল জমেই আছে | প্যান্ট গুটিয়ে, জুতো হাতে নিয়ে বাড়িঢুকলাম | নতুন বৌদি দেখে হেসে লুটোপুটি |
“ বেশ হয়েছে | আচ্ছা জব্দ আজকে | বাড়ি বসে থাকো | ”
“ এই নতুন বৌদি, খিচুরী চাপাও| আর আলুভাজা, মাছভাজা | ”
“ বয়ে গেছে আমার | ”
“ করবেনা না তো, আড়ি, যাও ” খুবগম্ভীর মুখ করলাম |
“ বাবুর আজকাল কথায় কথায় রাগ হয়, তাই না ? লিপি আসুক, তখন রাগ কোথায় যায় দেখবো | ”
নতুন বৌদি ’ র হাতটা জোরে চেপেধরলাম |
“ ছাড়ো ”
“ ছাড়বনা | আগে বলো খিচুরী হবে ”
“ হবে ”
এবারও হাতটা ছাড়িনি | হাতের পাতাটা টেনে এনে আমার বুকে রাখলাম | কাঁধে হাত দিয়ে টেনে আনলাম ওকে আমার কাছে | তারপর হাতের পাতায় খুব আলতো করে, ঠিক ওর নরম চামড়ার মতন নরম করে একটা চুমো খেলাম| “ ধ্যাত ” বলেই ও পালিয়ে গেলো |
“ পাজী কোথাকার, রাত দিন আমায়জ্বালিয়ে মারে | ” এই বলে রান্নাঘরে ঢুকলো | আমিও এলাম, পিছন পিছন | গ্যাসের প্ল্যাটফর্মের গায়ে ঠ্যাস দিয়ে নতুন বৌদি ’ র সাথে গল্প করে গেলাম |
“ আমার জন্য একটা কিচ্ছু কাজ করেনা পাজিটা | এই, পেঁয়াজটাকেটে দেবে ? ভীষণ চোখটা জলছে| ”
পাজি আর পেয়াঁজ ! প আর জ এর সম্মিলিত অনুপ্রাসটি মন্দ নয় | বাধ্য ছেলের মতন ঘসঘস করে পেয়াঁজ কেটে দিলাম | বললাম, “ তাকাও, তো | চোখটা দেখি – আর জ্বলছে না তো? ”
নতুন বৌদি বড় বড় চোখে আমার দিকে তাকালো | আমি গাইলাম,
“ ও গো কাজল নয়না হরিণী ”
“ ধ্যাত, ফাজিল কোথাকার | খালি বিরক্ত করে | সব ভুলভালহয়ে যাচ্ছে কিসের পর কি দেবো| খিচুরী আজকে খেতে পারবেনা বলে দিলাম ”
“ খিচুরী খেতে না পারলে আর কিছু খেয়ে নেবো তোমার কাছ থেকে | চেয়ে নয়, একদম কেড়ে | ”
চড় চাপড়, কানমলা সব পুরনো হয়ে গেছে | কাটা পেয়াঁজটা তেলে ছেড়ে একেবারে খুন্তি হাতেই তাড়া করলো ঘর অবধি |
দ্বিতীয় মাসের মাইনেও পেয়েগেলাম | এখন আমি confirmed শেঠ | সেই সঙ্গে ওরা জানিয়ে দিলো যে ২৫ শে সেপ্টেম্বর ট্রেনিং লেকচার শেষ হয়ে যাবে | তারপর ট্রেনিং রিপোর্ট HR এ জমা করে ব্যাঙ্গালোরে চলে যেতে হবে| মনটা দিনের থেকে দিন খারাপহয়ে আসছে যখনি ফিরে যাবার কথা ভাবতে হচ্ছে | আর সেই মনখারাপ কাটাবার জন্য যতটা সময় পেতাম, নতুন বৌদি ’ র সাথে খুনশুটি করে কাটাতাম | একদিন ভি-টি তে গিয়ে রেলের টিকিটও কেটে আনলাম | টিকিটটা যখন drawer এ রাখছি, নতুন বৌদি পিছনে ছিল| বললো, “ কবে যাবে ? ” চোখটা ছলছল করছিলো ওর | “ 7th October ” | “ না, ছোট ঠাকুরপো না | আমি কি নিয়ে থাকবো তখন ? ” বলে অঝোরে কেঁদে ফেললো আমায় জড়িয়ে ধরে | “ এই দ্যাখো আমার নতুন বৌদি | বলেছিনা, একদম কাঁদবেনা | একদম বোকা তুমি | আমি আবার চলে আসবো | ছুটি পেলে তোমায় এসে জ্বালিয়ে যাবো | আর বোম্বেতে আমাদের হেড অফিস | কাজের ছুতো করেই চলে আসবো | ”

ষষ্ঠ পর্ব
“ আমার দিন ফুরালো ব্যাকুল বাদলসাঁঝে
গহন মেঘের নিবিড় ধারার মাঝে ”
এখন আর নতুন বৌদিকে নিজের কাছ থেকে ছাড়তে ইচ্ছাই করেনা | মাঝে মাঝেই ওর হাতটাধরে ফেলি, চুল ধরে টানি, গলায় সুরসুরি দিই, আচমকা চিমটি কাটি, ও খেয়াল না করলে চুল খুলে ফেলি | রান্না ঘরে থাকলে পিছন থেকে আচমকা এসে এসে ওকে জড়িয়ে ধরি | মাঝে মাঝে আমাকে মারতে আসে, পালায়, আবার অনেক সময়তে রয়েওযায় | যখন পালিয়ে যায়, দৃষ্টিএড়ায়, তখন কি ও “ ডাক দিয়ে যায়ইঙ্গিতে ” ? যখন রয়ে যায়, সে কি আমার দুষ্টুমির আকর্ষণে? মনে হয়, “ আমায় এ তুমি কি করে দিলে নতুন বৌদি ? কেন আমায় দিনের থেকে দিন তোমার জন্য পাগল করে দিচ্ছ ? ” বলতামনা, বললে আবার যদি ওর চোখের থেকে জল পড়ে ? তাহলে আমার ভীষণ কষ্ট হবে যে |
শনিবারে আমি আর ও বাড়ি থাকি| নতুন বৌদি স্নানে ঢুকলে অনেকক্ষণ লাগে, আগেই বলেছি |সে সময়টা আমার ভীষণ একা একা লাগে | খুব রাগ হয় ওর উপরে | আর দুষ্টুমির বাসনাটাও বেড়েযায় |
একদিন স্নানঘরে সবে জল ভরার আওয়াজ পাচ্ছি, গান তখনো শুরুহয়নি | আমি দরজায় গিয়ে টক টক করে টোকা মারলাম | ও আমার কথা শুনবার জন্য কলটা বন্ধ করতে আমি ফিসফিস করে বললাম বাইরে থেকে,
“ মহারানী, এখনো কি আপনি অনাবৃতা নন ? আপনার সঙ্গীত শ্রবন করিনা কেন ? ”
ও দরজার ছিটকিনিটা খুলে, এক চিল্থে ফাঁক করে উদলো কাঁধ আর মাথাটা বার করে মগ দেখিয়েবললো, “ মগের বারি খাবে ? ”
“ এ কি মগের মুলুক নাকি ? হ্যা, খাবো | তুমি মারবার জন্য বাইরে বেরবে না কি আমি তোমার কাছে মার খাবার জন্য ভিতরে ঢুকবো ? ”
আমার কাছ থেকে এহেন উত্তর পেলে ও আর কি প্রত্যুত্তর দেবে ? খুব চিত্কার করে “ পালাও এখান থেকে বলছি ” , বলে ও আমার মুখের উপরে দরজাটা জোরে বন্ধ করে দিলো |
“ আচ্ছা অভদ্র তো তুমি ? মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিচ্ছ ? ”
ততক্ষণে নিজেকে সংযত রাখবারজন্য লজ্জিত হয়ে নিজেকে বোঝাতাম – না, সীমারেখার মর্যাদা করাটা একান্তই প্রয়োজন | না হলে ভীষণ বিপদ!!
নতুন বৌদি সেদিন গাড়িতে বসে মেজদার কাছে বলছিলো, ওর পাহাড়ে যেতে ভীষণ ইচ্ছা করে| বম্বের কাছেই অনেক পাহাড়ি জায়গা – লোনাভলা-খান্ডালা , মহাবালেশ্বর-পঞ্চগনি, মাথেরান | ওর এখনো যাওয়া হয়নি | ভীষণ ইচ্ছা করলো যদি আমরা তিনজন মিলে একটু বেড়িয়ে আসি দু-চারটে দিন | মেজদার গাড়িতে – ইইস, কি মজাই না হবে ?
ব্রেকফাস্টের সময়ে মেজদাকে বললাম | মেজদা খবরের কাগজ থেকে চোখটা ক্যালেন্ডারের দিকে সরিয়ে বললো, “ কবে যেতে চাস ? ”
“ আমার ট্রেনিং লেকচার 25th September শেষ হয়ে যাচ্ছে |চলোনা, তার পরদিনই বেরই | ২৬,২৭, ২৮ – তিনটে দিন মহাবালেশ্বর এ কাটিয়ে ২৯ যদি ফিরে আসি | ”
“ হু | তার আগের week এ AGM, কিন্তু ওই week এ নেদারল্যান্ড delegation, দাঁড়া, আমি schedule টা দেখেবলছি | ”
“ শোনো মেজদা, তুমি দেখি বললেতো হবেনা, হোটেল বুক না করলে পাহাড়ে গিয়ে অনেক ঝামেলায় পরতে হয় | আজে বাজে জায়গায় আমরা থাকতে পারবনা | মহালয়ার পর কলকাতা থেকে টুরিস্ট আসতে আরম্ভ করবে | আমি দুটো রুম বুক করে দিতে চাই | ”
“ আরে রুম বুক করে দে, তারপর দেখি | ”
“ আমি কিন্তু যাবো | সে তুমি যেতে পারো কি না পারো তোমার ব্যাপার | চার বছরে এক বারেরজন্যও যাইনি | ছোট ঠাকুরপো চলে গেলে যাওয়া হবেওনা আর | ” নতুন বৌদি বললো |
“ সে ঠিক আছে, নিশ্চয়ই যাবে | আর দেখি, আমি ম্যানেজ করতে চেষ্টা করবো | ”
শেষ অবধি মেজদা পারেনি | সেইনেদারল্যান্ডের দল, তাদের সাথেই মেজদার কোম্পানির কন্ট্রাক্ট হবে, আলাপ আলোচনা চলবে তাজ হোটেলে | নতুন বৌদি ’ র মেজাজ খুব খারাপহয়ে গেলো |
“ তুমি মেজদার উপরে এত রাগ করছে কেন ? ও কি করবে ? বিদেশী দল, ওরা ওদের সুবিধা মতন আসবে, মেজদার কথায় থোড়াইওদের দিন পাল্টাবে ? ”
নতুন বৌদি কোনো কথা বললনা | বললো, “ আর তোমার মেজদাকে রেঁধে দেবার জন্য আমি রয়ে যাবো ? ”
“ আরে, আমার তো লাঞ্চ, ডিনার – সব তাজে তখন | তুমি ঘুরে এস ক ’ টা দিন বাবুর সাথে | ভালো লাগবে | ” ছোট ভাইয়ের উপরে মেজদা ভরসা করে |

দুজনেই চেয়েছিলাম মেজদা সঙ্গে থাকুক | সেটা হলনা | গেলে নতুন বৌদির ভালো লাগবে,তাই গেলাম |
বম্বে থেকে মহাবালেশ্বর পুনে হয়েও যাওয়া যায়, আবার সোজা যাবার বাস রুট আছে | আমরা পুনে অবধি ট্রেনে গিয়ে তারপর বাসে যাবো বলে ঠিক করলাম | বম্বে থেকে সকালের ট্রেন ডেকান কুইন যায় পুনেতে | পথটা ভারী সুন্দর | কার্জাতের পর ট্রেন ওঠে পশ্চিমঘাট পাহাড় বেয়ে | বেশি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে রেল পথ তৈরী করেনি ব্রিটিশরা | টানেলের পর টানেল পেরিয়ে উঠে যায় ট্রেন | দুটো ইঞ্জিনে ধীরে ধীরে টানতে থাকে | পশ্চিম ঘাটে চড়ে লোনাভলা, খন্ডলা, তারপর আরো বেশ কয়েকটা স্টেশন পেরিয়ে পুনে | উপভোগ করবার দৃশ্য কার্জত থেকে লোনাভলা |
নতুন বৌদির আর আমার ছিল পাশাপাশি সিট | আমি ওকে জানালার ধারে বসতে দিলাম | সকাল সকাল বেরোতে হয়েছে বাড়ি থেকে, তাই নতুন বৌদির খুব ঘুম পাচ্ছিলো | ট্রেনের দুলুনিতে ওর ঘুম আসে | আমার ঘাড়ে মাথা এলিয়ে চোখটা বন্ধ করলো | কালো রঙের ওপর প্রিন্ট শাড়ি | ভীষণ মানায় ওকে | চুলটা উড়লে ওর অস্বস্তি লাগে, জানালার কাঁচটা নামিয়ে দিলাম | মাথাটা বেশি ঝুঁকে গেলে ওর ঘাড়ে ব্যথা করবে, ও কষ্ট পাবে | আলতো করে ওর চুলে হাত রেখে চেষ্টা করলাম মাথাটা যেন হেলে না যায় | ওর ঘুম এসেগেছে | আসে পাশের যাত্রীদের মধ্যে কেউ কেউ ঘুমোচ্ছে | একঅল্পবয়সী দম্পতি, সেই মেয়েটিও মাথা এলিয়ে দিয়েছে তার ভালোবাসার মানুষটির ঘাড়ে | ভীষণ ইচ্ছা করলো নতুনবৌদি ’ র মাথায় আলতো করে হাত বোলাতে | তাই করলাম | আরামে ওর ঘুমটা একটু গভীর হলো | একের পর এক ঝর্ণা পেরিয়ে চলেছি | সদ্য সদ্য বর্ষাকাল শেষ হয়েছে, তাই ঝর্নাধারায় তেজ আছে | ইইস, নতুন বৌদি দেখছেনা, বেরসিকের মতন ঘুমাচ্ছে ? ঘাড়ে টোকা মারলাম, ওকে জাগাতে | ট্রেনটা ঠিক তখনি থেমে গেলো| চারপাশে আওয়াজ নেই, শুধু সামনের ঝর্ণাটার কলকল আওয়াজ|
– “ দ্যাখো ” ওকে বললাম |
– “ ও মা, কি সুন্দর | এই, আমায় আগে ডাকলেনা কেন ? ”
– “ এই তো আস্তে আস্তে উঠছি, বুঝতে পারছনা ? আরো কত ঝর্ণা, পাহাড় পাবে | ”
– “ দ্যাখো তো, এত সুন্দর জায়গাগুলি ! একবারও আমায় নিয়ে আসেনি তোমার মেজদা | ”
– “ miss করছো মেজদাকে ? ”
– “ বয়ে গেছে ”
– “ তার মানে করছো | ”
– “ কি করে জানলে ? ”
– “ তোমরা উল্টোটা বলো | ”
– “ তোমরা মানে ? ”
– “ মানে মেয়েরা | ”
– “ কটা মেয়ে দেখলে শুনি ? ”
– “ দুটো ”
– “ কে ? ”
– “ একটা লিপি, একটা তুমি | ”
নতুন বৌদি হাসলো |
– “ হাসলে কেন ? ”
– “ বলবনা | হাসি পাচ্ছে, তাই হাসলাম | ”
ইচ্ছা করছিলো আমি আর ও দৌড়ে গিয়ে ঝর্নার জলটা ধরি |
ভাবতে ভাবতেই “ পুঁ ” করে জোর আওয়াজ | ট্রেনটা আস্তে আস্তে আবার গড়িয়ে গড়িয়ে চললো |
আবার টানেল | অন্ধকার | ওকে কাছে টানলাম একটু | আবার আলো, বাইরেটা | এবার অন্য রকমের পাহাড় | আবার টানেল, আবার আলো | ঠিক যেন লুকোচুরিখেলা চলেছে |

সপ্তম পর্ব
পুনে থেকে বাসে চড়লাম | পাহাড়ের পাকদন্ডী বেয়ে বাস আওয়াজ করে ধীরে ধীরে উঠে চলেছে | সদ্য সদ্য বর্ষা শেষহয়েছে, চতুর্দিকে সবুজের সমারোহ | এ দিকটায় বর্ষাকালে বৃষ্টিও প্রচুর হয় | ঝোপঝাড়ের আবডাল দিয়ে কখনো দেখছি পাহাড় সোজা নেমে গিয়েছে খাদে, কত নীচে, কত গভীরে | ভয় লাগে হঠাত করে নিচে তাকাতে, আবার একটা স্বর্গীয় সৌন্দর্য পাই পথেরনানান জায়গায় | শহরের ব্যস্ত জীবন থেকে সকলেরই সুযোগ খোজা উচিত প্রকৃতির অফুরন্ত শোভার সামান্য একটুখানি হলেও সেটুকুই উপভোগ করতে বেরিয়ে পরবার | যাঁরা করেন, জীবনে তাঁরা অনেক বেশি আনন্দ খুঁজে নিতে পারেন | যাঁরা কাজ কাজ করে পাগল, সুযোগ খুঁজে নিতে জানেননা, তাঁরা এ আনন্দ থেকেবঞ্চিত | নতুন বৌদি থেকে থেকেই মেজদার কথা বলছিলো |
অনেক উপরে উঠে গেছি | কত কথা বলেছি দুজনে, আবার এক এক সময়ে চুপ করেও উপভোগ করেছি |কথা বললে ভাষা, কথা না বললেও তার একটা ভাষা আছে |
শরত এসে গেছে | ৭ ই অক্টোবর আসতে শুধু এগারোটা দিন বাকি| শরত আসার পর থেকে প্রতিদিনই শারদপ্রাতে শুনছি বিদায়গাথা | কেউ যেন আমায় টেনে ধরে বলছে “ না ” , “ না ’ , “ না ” |
এই “ না ” কথাটা কতরকম ভাবে ব্যক্ত করা যায় | “ এটা করো না ” , “ এটা বলো না ” – এই একটা “ না ” বোঝায় অসম্মতি | একটা বারণ | বারণ মানতেও পারি, নাও মানতে পারি | যদি বলি “ নানা ” – দুইবার, তাহলে মনে হয়নাকি একটা আদেশের মতন ? যদি তিনবার না বলি ? “ না না না ” , সেই না তে একটা আকুতি, জেদ | মানতেই হবে | একটা ছোট্ট বাচ্চার সাথে যদি খুব খেলি, তারপর তাকে এক সময়ে বলি, “ টা টা ” , তাহলে সে আমাদের মাথা নাড়িয়ে বলে, “ না, না, না – তুমি যাবেনা | ” বেশি জেদী হলে সে হাতটা ধরে টেনে রাখবে| এই না না না – এটা সেরকমই | যত বলি “ এবার যে যেতে হবে ” , দুয়ার আগলে বলে যাবে “ না না না | ” আঁখি ফিরালেই “ না না না ” | যত বলি “ রাত ফুরিয়ে এলো, বাতি মলিন হয়ে গেলো ” , আমার মুখের দিকে চেয়ে তবু বলে যাবে “ না না না ” | মিলনপিয়াসীহলে তখনও তিনটে না দিয়েই তাকে ধরে রাখা, মাঝে একটু একটু করে কথা জুড়ে দিয়েই “ নাযেও না, যেও না কো ” | যদি তিনবার না বলেই উত্তরটা দিয়ে দেওয়া যেত, “ না না গো না, করোনা ভাবনা | যদি বা নিশি যায়, যাবনা যাবনা | ” তাইকি হয় নাকি ?
দুপুর গড়িয়ে যাবার পর আমরা মহাবালেশ্বর পৌছলাম | একটু একটু ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব বাতাসে | টাউন থেকে হোটেলটা একটু দূরে | অল্প কয়েকটা ঘর, location টা ভারী সুন্দর | ওখানে বসে সারাটা দিন কেটে যাবে পাহাড় আর নীচে বয়ে যাওয়া নীল রঙের নদী দেখে |
ঘর চাওয়ার সময় হোটেলের রিসেপশনের লোকটি একটু অবাকইহলো | দুজন মানুষ অথচ দুটো ঘর বুক করা আছে কেন ?
“ আপ দোন রুম বুক কিলেলে ? ” অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো |
এ সব মারাঠি হিন্দি | এখানে ওরকমই চলে, বিশুদ্ধ হিন্দি বললে চলবেইনা |
ভদ্রলোককে বোঝানো হলো টাকাপয়সা যখন দেওয়া আছে, আপনার “ দোন ” রুম দিতে অসুবিধা কোথায় ?
– “ নেই নেই, আপুনকো প্রবলেম কা আহে ? বিন্দাস রহ না দোন রুম লেকে | ” বলে চাবি দিয়ে একটা ছেলেকে ডেকে বললো ঘরে নিয়ে যেতে |
দুটো ঘর, একটায় ঢুকলো নতুন বৌদির সুটকেস, আর একটায় আমার | দুটো ঘর পাশাপাশি, মাঝে একটা দরজা | ভিতর দিয়েইঅন্য ঘরে যাওয়া যায় | নতুন বৌদিকে বললাম, “ আড়ি হলে দরজাটা বন্ধ থাকবে, ভাব হলে খোলা | কি বলো ? ”
“ হু , বুঝলাম | এই মুহুর্তে একদম আড়ি | আমি একটু চেঞ্জ করে ফ্রেশ হয়ে আসি | ”
আমিও নিজে ফ্রেশ হয়ে নিলাম |নতুন বৌদি একটু পরে পরিষ্কার হয়ে বেরোলো | দরজাটা খুলে আমার ঘরে আসতেই বললাম, “ ব্যাস, এবার ভাব তো ? ”
“ না | আগে চা এর কথা বলে এস তোএকটু | রোজ তো ‘ নতুন বৌদি, চা ’ , ‘ নতুন বৌদি, চা ’ বলে বলে আমায় বিরক্ত করো | এ কয়দিন তুমি চা আনিয়ে খাওয়াবে | ”
আমি ওই ছেলেটিকে চা এর কথা বললাম | ফিরে এসে দেখি নতুন বৌদি উধাও | গেলটা কোথায় ? হোটেলের চারপাশে ঘুরে ঘুরে নানান নাম ধরে ধরে ডেকে চলেছি, “ এই নতুন বৌদি, এই মলি, আমার মল্লিকা বন, বনমল্লিকা, ও গো চিরনূতন ”
“ এই, কি আরম্ভ করেছ বলত ? লোকজন কি ভাববে ? ”

দেখি কয়েকটা ধাপ নেমে একটা ভীষণ সুন্দর জায়গা |দুটো চেয়ার আর একটা ছোট্ট টেবিল পাতা | সামনেই খোলা অফুরন্ত পাহাড় | সেখানে নতুন বৌদি রেলিংটা ধরে দাঁড়িয়ে আছে |
“ কি ভাববে ? এখানে আপুনকো, কিলেলে, দিলেলে – এ সবই বুঝবেলোকে | ”
“ আর বাঙ্গালী টুরিস্ট থাকলে? ”
হাওয়া দিচ্ছিলো | ওর চুলগুলি উড়ছিল মুখের সামনে| চুল উড়লে মেয়েদের ভীষণ ভালো দ্যাখায় | আর এত বিরক্তহয় ওরা যে বারবার চুলটা সরায়| এতে আরো ভালো লাগে, যতবার সরাবে, ততবার ভালো লাগবে | পাশে এসে দাঁড়ালাম |
“ ছেলেটা ঘরে চা নিয়ে আসবে | আগে রুমে যাই চলো | ”
“ কোত্থাও যাবনা | কি অপূর্ব জায়গাটা | ছেলেটাকে বলো, এখানে চা নিয়ে আসবে | ”
প্রায় সূর্যাস্ত হয়ে আসছে| চা এর খালি কাপ প্লেটগুলি পড়ে আছে, ছেলেটা এসে নিয়ে যায়নি এখনো | সূর্যাস্তের ছটা নতুন বৌদির মুখে এসে পরেছে | পড়ন্ত রোদের সাথে ওরগায়ের রংটা কি সুন্দর মানিয়েছে |
“ তোমার রংটা মোটেও কালো নয় | এখন যে রংটা দেখছি, সেটাই তোমার রং | ”
“ ধ্যাত, কালো | সবাই বলে | ”
“ না, অস্তগামী সূর্যের রং এরমতন | ”
“ মোটেও না | ঠিক সন্ধ্যার রংটা আমার গায়ে | ”
সূর্যটা ডুবে আসছে | আবার কাল আসবে | সাঁঝের রঙে হৃদয়্গগনে আমার সব কিছু রঙিয়ে যাচ্ছে | আলো তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যাচ্ছে | ওকে একটু কাছে টেনে চোখের দিকে চোখ রেখে গাইলাম,
“ তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা, তুমি আমার সাধের সাধনা,
মম শুন্য গগনবিহারী ||
আমি আপন মনের মাধুরী মিশায়ে তোমারে করেছি রচনা-
তুমি আমারি, তুমি আমারি,
মম অসীম গগনবিহারী || ” শুন্য গগনবিহারীকে অসীম গগনবিহারী করবার মাঝে একটা উত্তরণ ঘটে গেছে | তোমাকে আমার করে নিতে হয়েছে |
একসাথে যখন গাইছিলাম শেষটা, অন্তরের গভীরে কাঁপছিলো সব কিছু,
“ মম সংগীত তব অঙ্গে অঙ্গে দিয়েছি জড়ায়ে জড়ায়ে,
তুমি আমারি, তুমি আমারি,
মম জীবনমরণবিহারী || ” না না না, মরণ শব্দটাকে বাদ দেবো, মরণে যে আমার ভীষণ ভয় |জোর করে আঁকড়ে ধরে রইলাম ওকে| অঙ্গে অঙ্গে জড়ায়ে জড়ায়ে গান গেয়ে যাবো আমরা |
– “ কবে থেকে লেখো ? ” হঠাত করেই নতুন বৌদি প্রশ্নটা করলো |
– “ কি লিখি ? ”
– “ এই যে এত সুন্দর করে গল্প লেখো ”
– “ নতুন বৌদি, তুমি কি করে জানলে ? ” আমি শঙ্কিত হয়ে উঠলাম |
– “ জানবনা কেন ? তুমি অসাবধানে খাতা ফেলে রেখে অফিসে চলে যাবে, আর আমি ঘর গোছাতে এসে হাতের কাছে লেখা পেলেও চোখটা বন্ধ করে থাকবো,তাইনা ? ”
– “ এটা কিন্তু ভীষণ খারাপ | আমি চাইনা কেউ আমার লেখা পড়ুক | Intrusion of privacy |কেন করলে এমন ? ” আমি খুব গম্ভীর হয়ে বললাম |
একটুক্ষণ ঝগরা করে মেজাজটা খারাপ করে ফেললাম | আর নতুন বৌদি বেশ তর্কও করে | মাঝে মাঝে এঁড়ে তর্ক |
– “ তোমার লেখা কাউকে পড়াও নি বলতে চাও ? লিপিকেও না ? ”
– “ না, লিপিকেও না | দেবোও না কোনদিন | ” খুব বিরক্ত হয়ে বললাম | কথাই বলতে ইচ্ছা করছিলনা নতুন বৌদির সাথে আর|
– “ শাড়িটাও দেবেনা ? পাহাড়ী রাস্তা বয়ে, নিজের সুটকেস ভারী করে নিয়ে এসেও ওকে দেবেনা ? ”
– “ মানে, তুমি জানো আমার সুটকেসে কি আছে ? ” আমি রেগে গিয়ে প্রশ্ন করলাম |
– “ তুমি তোমার খাটে প্যাকেট রেখে জিনিস গোছাতে গোছাতে বার বার আমার কাছে এসে এসে বলবে নতুন বৌদি এটা কই, নতুন বৌদি ওটা কই আর আমি একবারের জন্যও ঘরে যেতে গিয়ে দেখে ফেলবনা, এতটা বোকা আমায় না ভাবলেই পারতে | এবারও বলো intrusion of privacy ? মুখে বড় বড় বুলি বলতে তো আটকায়না বাবুর | ”
কি আর বলবো ? হাতে নাতে ধরা পড়ে গিয়ে আমার কি অবস্থা !
এইবার নতুন বৌদি ফিক ফিক করেহাসতে হাসতে বললো (আমি তো ফিরেও তাকাচ্ছিনা ওর দিকে) “ দেবরজী, ম্যানেজটা সেদিনই দিতে পারনি | শাড়ির সাথে ব্লাউজ কিনবে, শায়া কিনবে – সবই নতুন বৌদির মাপে মাপে হবে – এতটা বোকামো না করলেই পারতে | ”
এইবার ভীষণ দুষ্টু হেসে আমায় বললো, “ কখন দেবে ? ”
“ কালকে সকালে | কাল ২৭ শে সেপ্টেম্বর | তোমার জন্মদিন| আমার মনে আছে | ”
“ আমার কাছেও কথা গোপন করতে তোমার ভালো লাগে ? ”
“ পারলাম কই ? হারিয়ে দিলে তো| ”

দূরে, নীচে, অন্ধকার পাহাড়েরগা বেয়ে দু একটা গ্রামের আলোঝিকমিক করছিলো | চারপাশটা কী নিস্তব্ধ | হালকা হালকা ঠান্ডা | আমার গায়ের পাশে, একদম গা ঘেঁষে আমার লিপি বসেআছে | অপূর্ব একটা অনুভূতি হচ্ছিলো | এ মুহুর্তগুলি মনের ভিতরে রয়েই যায় | ছবি না তুললেও |
রাত্তিরের খাওয়া শেষ করে আবার এসে বসলাম আমাদের নিজেদের সেই জায়গাটিতে | নিঝুম রাত, আমরা বসে বসে গল্প করছি | ও বললো “ সারাক্ষণ বক বক করলে ভালো লাগেনা | একটু চুপ করে বস | ”
“ আস্তে আস্তে একটু একটু কথা? চলতে পারে ? ”
“ পারে ”
“ কানে কানে কথা? ”
“ কি বলবে? ” ও আমার কানে কানে ফিস ফিস করে বললো |
“ একটা খেলা খেলবে ? ”
“ কানে কানে খেলা | একবার এই কানে, একবার ওই কানে | ”
“ কে বলবে ? ”
“ তুমি বলবে ”
“ কি বলবে ? ”
“ কিচ্ছুনা ”
একবার এই কানে, আবার ওই কানে,আবার এই কানে, আবার মুখ ডিঙিয়ে ওই কানে – বারবার | মজা হচ্ছিলো, হেসে লুটোচ্ছিলাম দুজনে | বড্ড বিপজ্জনক হয়ে উঠছিলো আমাদেরখেলাটা ! কানের সাথে মুখ, মুখের সাথে কান – দুইয়ের বদলা বদলিতে বিপত্তিটা ঘটেইগেলো |
আমি পারলামনা | হেরে গেলাম | ঠোঁটের সাথে ঠোঁট – মিলে মিশে একাকার হয়ে গেলো | আমারলিপির ঠোঁটে আমার প্রথম চুম্বন | নিঃশ্বাস এর সাথে নিঃশ্বাস মিশে যাচ্ছে, ঠোঁটের স্পর্শের আদ্রতা মিলে যাচ্ছে – মিলেমিশে একটাই সিক্ততা এনে দিয়েছে সেই অনাবিল অন্তরঙ্গতার আচমকা ঢেউ এ | সব ভয়ডর, দ্বিধাদন্দ, বৈধতা-অবৈধতা সব গলে প্রেমের জোয়ারে, পাল তোলা নৌকোর মতন ভেসে চলেছে |নিজের বুকের হৃদকম্পন নিজে শুনতে পাচ্ছি – ঢক, ঢক, ঢক | আমি যেন একটা চুম্বকের আকর্ষণ থেকে নিজেকে আর ছাড়িয়ে নিতে পারছিনা |
“ নতুন বৌদি | আমায় ক্ষমা করো,নতুন বৌদি | আমি আর পারলামনা| তোমার কাছে আসতে আসতে আর সামলাতে পারলামনা | তোমাকে যে বড্ড বেশি ভালোবেসে ফেলেছি আমি | ”
ওর মুখে কথা নেই | আমায় আঁকড়ে রেখে ও আমায় তখনো আদর করে চলেছে |
অনুভূতির পরশ, আরাম আর ভোরবেলা থেকে জেগে থাকবার ক্লান্তি – সব মিলিয়ে আমার চোখ দুটো ঘুমে জড়িয়ে আসছে | ওর গায়ে মাথা এলিয়ে দিয়েছি |
“ এভাবে পারবেনা, ব্যথা লেগে যাবে | ঘাড়ে টান পরবে | শুয়ে পড়, ঘরে গিয়ে | সেই কোন সকালেউঠতে হয়েছিল বলত ? ”
ঘরে এলাম | ও একটু নিজের ঘর থেকে এলো |
“ ঘুমাও নি এখনো ? ”
“ একটু থাকো আমার পাশে | ”
“ আমি তো আছি, একদম তোমারি পাশে | ” আমার পাশে এসে বসলো লিপি | নিজেই বুকের মধ্যে আমার মাথাটা টেনে নিলো | ওর আঁচল দিয়ে আমার মুখটা ঢাকা |মনে হলো,
“ তব অঞ্চল ছায়া মোরে রহিবে ঢাকি |
মম দুঃখ বেদন, মম সকল স্বপন
তুমি ভরিবে সৌরভে নিশীথিনী-সম | ”
ঘুমের আগে ওর কাছে গান শোনবার আবদার করেছিলাম | ও গাইছিলো,
“ কেবল তুমিই কি গো এমনি ভাবে, রাঙিয়ে মোরে পালিয়ে যাবে,
তুমি সাধ ক ’ রে, নাথ, ধরা দিয়ে আমারও রং বক্ষে নিও
এই হৃদ্কমলের রাঙা রেনু, রাঙাবে ওই উত্তরীয় || ”
এক সময়ে দেখলাম, ভোর হতে আসছে | আবছা আলোয় ওকে ভীষণ মিষ্টি লাগছিলো | ও শুয়ে ছিল, চোখটা বন্ধ করে |
আজ ২৭ শে সেপ্টেম্বর | নতুন বৌদির ২৭ বছরের জন্মদিন | প্রকৃতি ওকে একগুচ্ছ ভোরের আলো পাঠিয়ে দিলো, জন্মদিনের উপহার হিসাবে |

অষ্টম পর্ব
সকালে উঠে নতুন বৌদি চলে গেলো নিজের ঘরে | আমি মুখ ধোব বলে বাথরুমের বেসিনের সামনে এলাম | আয়নায় নিজেকে দেখলাম | আমার ঠোঁটে নিজেরই আঙ্গুল ছোঁয়ালাম | সেখানে কি এখনো লেগে রয়েছে কাল রাতের ওই হঠাত হাওয়ায় ভেসে আসা আনন্দময় মুহুর্তটির ছোঁয়া ? এখনো কি পাওয়া যাচ্ছেনা প্রেমে, উত্তাপে সিক্ত নিবিড় অন্তরঙ্গতার স্বাদ আর গন্ধটুকু ? কোন পুন্যে এই পুরস্কার পেয়েছি?কেন ? কেন এভাবে ভালোবেসেছি? ভালো যদি বেসেইছি তো এর পর কি ? এর পর কি হবে ? জলে ভেসে যাচ্ছিলো দু চোখ, কল থেকে পরা জল চোখে দেবার আগেই, যখন মনের মধ্যে ফিরে ফিরে বাজছিলো ওর গাওয়া কাল রাতের ওই গানের কলিটা –
কেবল তুমিই কি গো এমনি ভাবে, রাঙিয়ে মোরে পালিয়ে যাবে
এ ভাবে ভালোবাসলে তার চরম আকাঙ্খা একটাই – হৃদয়ে, শরীরের অনুতে, পরমানুতে, সব টুকু পাওয়া | যদি পাইও, তারপর ? যে আমার হৃদয়ে ইতিমধ্যেই মিশে গেছে, যাকে আরো কাছে পাবার জন্য আমি ব্যাকুল থেকে ব্যাকুলতর হয়েউঠছি, সে বিবাহিতা, আমারি অগ্রজের স্ত্রী | এতটা ভালোবেসে কেমন করে জেনেশুনেতাকে কলঙ্কিনী করতে পারি, মেজদার সাথে এতটা ছলনা করতে পারি, যে বিশ্বাসে ও আমাদের দুজনকে এখানে আসতে দিয়েছে সে বিশ্বাস ভেঙ্গে ওর সাথে প্রতারণা করতে পারি ? না, না,না – এ আমি পারবনা, আমায় দূরেসরতেই হবে | নিজের মনে জোর করেই প্রতিজ্ঞাটা করলাম |
স্নান সেরে dress করলাম, তখনি দুই ঘরের ভিতরের দরজাটা খুলে গেলো | লিপি বেরোলো | আমি এক মনে তাকিয়ে ছিলাম ওর দিকে | আমারি দেওয়াওই কালো প্রিন্টেড সিল্কের শাড়িটা পরে | শুধু একটিই কথামুখ দিয়ে বেরোলো –“ কি করে এতসুন্দর হলে লিপি ? ” জন্মদিনের থেকেই লিপি হয়ে গেলো আমার দেওয়া বহু নামের আর একটি নাম | অদম্য ইচ্ছা হলো এক্ষুনি ওকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে | একটু আগেই নিজেকেনিজের করা প্রতিজ্ঞাটা স্মরণ করে আর এগোলামনা | ও হাতটা মেলে ধরলো, তখন নিজেরইকরা প্রতিজ্ঞা চুরমার করে ভেঙ্গে ফেলে ছুটে গেলাম ওর দিকে | জড়িয়ে ধরে আদর করলাম, প্রাণ ভরে আদর খেলাম | কোনটাযে বেশি ভালো – আদর করা না কিআদর খাওয়া, তা বলা মুশকিল | কি ভাগ্য যে লিপস্টিক তখনো লাগায়নি |
দুজনে একসাথে বেরোবো আজকে | সারাদিন ঘুরবো পাহাড়ে পাহাড়ে | আমাদের গাড়ি তৈরিই ছিল |
মহাবালেশ্বর থেকে প্রতাপগড় এর দূরত্ব ২৪ কিলোমিটার | ছত্রপতি শিবাজীর একটি দূর্গ, এখানে একটি পাহাড়ের মাথায় | সারাটা পথে আমাদের সঙ্গী সহ্যাদ্রি, আর নীচ দিয়ে বয়ে যাওয়া সাবিত্রী নদী | ভুবনমোহিনী দৃশ্য, সে কোনদিনও ভোলার নয় | আমাদের পথ চলায়, কখনো পেরিয়ে চলেছি উচু উচু পাথর, কথাও বা সিঁড়ি| মন্দিরের উপর থেকে দেখা যায় পাহাড়ের বিশাল বিস্তৃতিআর নীচের ভ্যালি | সারাটা দিন ঘুরেছি দুজনে | দুপুরে ঘুরেছি মহাবালেশ্বরের দ্রষ্টব্য স্থানগুলি | লুডউইক্ পয়েন্ট, কেটস পয়েন্ট, এল্ফিন্সটন পয়েন্ট, টাইগার স্প্রিং এবং সেখান থেকে আর একটু এগিয়েই মহাবালেশ্বরের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ আর্থার সীট | আর্থার সীট থেকে নীচে তাকাতে ভীষণ ভয় করে | মনে হয়, একবার গড়িয়েপড়লে একেবারে কয়েক হাজার ফিট নীচে তলিয়ে যাবো | দুজনেএকসঙ্গে যদি তলিয়ে যাই ? সে মৃত্যুকে আমি ভয় পাইনা |
আমি ওর ছবি তুলছিলাম | আমার থেকে অল্প একটু বড় হবেন এক ভদ্রলোক আমাদের দুজনকে পাশাপাশি দাঁড়াতে বললেন, আমাদের ছবি তুলে দেবেন বলে |শুধু পাশাপাশি দাঁড়ালেই হবেনা, ক্লোজ হতে হবে | দুজনকেই সমানে ইঙ্গিত করছেনক্লোজ হতে, নইলে ছবি রোম্যান্টিক হবেই বা কি করে? ভদ্রলোক এক রকম দৃঢ় ধারনাইকরে নিয়েছেন যে আমরা নববিবাহিত দম্পতি | দুজনে বেদম উপভোগ করছিলাম ব্যাপারটা |
পথচলার মাঝে কোনো কোনো জায়গা একটু বেশি উচুনীচু | একটু কষ্ট হলে কোনো বড় পাথর পেলে বসে নিচ্ছি, সামনের অনির্বচনীয় সৌন্দর্যের টানে আবার এগুচ্ছি | নতুন বৌদির চেহারায় একটা মুক্তিরছাপ – কতদিন পর একটু যেন খোলা আকাশে নিঃশ্বাস নিচ্ছে, প্রতিদিনের একঘেয়েমির একটুখানি বাইরে এসে |
– “ ওইখানে যাবে ? ” পাহাড়ের ধারের একটা পাথরে বসে আমি জিজ্ঞেস করলাম |
– “ কোথায় ? ”
– “ ওই দূরের পাহাড়টায় ? একটা ছোট ঝর্ণা দেখতে পাচ্ছে ? ”
– “ কোথায় ? ”
– “ বায়নাকুলার টা নিয়ে দেখো | ”
একটুক্ষণ বাইনোকুলার নিয়ে নাড়াচারা করবার পর ও দেখতে পেলো |
– “ ওম্মা, কি সুন্দর ! ”
– “ আমি বলছি, ওইখানটায় যাবো | ”
– “ কি ভাবে শুনি ? উড়ে উড়ে | ”
– “ না, সুরে সুরে | ” আমি উত্তরকরলাম |
– “ সুর মিলিয়ে ? ”
– “ ওখানে পৌছে গিয়ে গলা খুলে গাইবো দুজনে ”
– “ কি গাইবে ? ”
– “ চিরনূতনের গানটা-
“ আপনারে দেয় ঝরনা আপন ত্যাগরসে উচ্ছলি-
লহরে লহরে নুতন নুতন অর্ঘ্যের অঞ্জলী ”

একটু থেমে আমি বললাম, “ কেন গলা খুলে গাইবো, সেটা জিজ্ঞাসা করলে না তো ? ”
“ কেন ? ”
– “ ঝর্ণার জলে লুকিয়ে লুকিয়ে তুমি আর আমি স্নান করবো একসঙ্গে, কেউ দেখতে পাবেনা আমাদের | ”
প্রেমিকার সাথে এহেন দুরন্তকল্পনাটি কোনো প্রাপ্তবয়স্ক যুবককে কি করতে পারে তা সহজেই অনুমেয় |
ও লজ্জায় মুখ লাল করে ফেললো –“ যাঃ, কি অসভ্য না তুমি | ”
“ মগের বারি টা তো খেতে হবেনা| ”
ও চিমটি কেটে বললো, “ ওঠ এখন ” |
হোটেলে ফিরতে ফিরতে প্রায় সন্ধে গড়িয়ে গেছে | আবার বসেছি আমাদের একান্ত নিভৃত সেই জায়গাটিতে | ছেলেটিকে চা দিতে বলে দুজনে বসে গল্প করে চলেছি, অস্তগামী সূর্যকে সাক্ষী রেখে |
– “ কাল তোমায় অনেক কথা জিজ্ঞাসা করবো ভেবেছিলাম | এমন রেগে গেলে যে করতেই পারলামনা | ”
– “ আচ্ছা, আর রাগ করবনা | বলো ? ”
– “ কবে থেকে লেখো ? ”
– “ খুব ছোটবেলাতে | তখন সবে ‘ রামের সুমতি ’ , ‘ বিন্দুর ছেলে ’ পড়েছি, ছোটদের শারদীয়াগুলি আগ্রহ নিয়ে পড়েছি, রবীন্দ্র রচনাবলী থেকে হাস্যকৌতুক গুলি পড়েছি – ভীষণ ইচ্ছা হত নিজেও একটু লিখি | লিখেও ফেলেছিলাম, সবাইকে তখন দেখাই | জানি, খুব হাস্যকর হিজিবিজি কিছুই নিশ্চই লিখেছি, একটা শিশু আর কিই বা লিখবে ? সবাই পরিহাস করেছিলো | নিজের অতি সামান্য সৃষ্টিতে অপমান একটা শিশুরও ভালো লাগেনা | আমি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলাম লেখা থেকে, এমন কি সাহিত্য থেকেও | বাড়িতে দাদা দিদিরা ভালো লেখেন, তাঁদের শব্দ ভান্ডার আমার চেয়ে কয়েক গুন বেশি, আমি সারা জীবন চেষ্টা করে গেলেও তাঁদের পর্যায়ে নিজেকে উন্নীত করতে পারবনা জানতাম | আমার ভাষা দুর্বল, বাংলা খাতা লাল দাগে দাগে ভরে যায় – আমি কিনা লিখবো ?
বাড়ির সন্ধ্যার আড্ডায় কত গুরুগম্ভীর প্রসঙ্গ আসতো – রাজনীতি, আধ্যাত্মিকতা | লেখাও হত, লেখা পড়াও হত, সে শব্দের ভান্ডারে সাঁতরাতে সাঁতরাতে দম বন্ধ লাগতো, বাক্যের কোথায় আরম্ভ, কোথায় তার শেষ, আমার সীমিত ক্ষমতায়তার হিসাব নিকাশ করতেও ছিলাম অক্ষম | ”
– “ এত অভিমানে সব ছেড়ে দিলে ? ”
– “ হ্যা, তাই | তখন মনে হয় সেভেন বা এইটে পড়ি | বাংলা সেকেন্ড পেপার এর পরীক্ষা চলছে | রচনা এসেছে, রচনা বই দেখে কিছু মুখস্ত করাও নেই |আমি নিজের মতন করে লিখছি, কথার ভাষার মতন করেই আমার লেখার ভাষা চলছিলো, কঠিন কিছুই নেই | জানি, ২০ র মধ্যে১০ পেলেই আমি ধন্য | পাশে এসে আমাদের স্যার দাঁড়ালেন| ভীষণ অস্বস্তি হয় তখন | টুকছিনা, কিছুনা – আমার পাশেএসে দাঁড়াবার দরকারটা কি স্যারের ? আমি লিখছিলাম | স্যার চুপ করে দাঁড়িয়ে | উনিবাংলার শিক্ষকও নন | কিছুতেই নড়ছেন না পাশের থেকে | আমি বারবার স্যারের দিকে তাকাচ্ছিলাম দেখে উনিওবুঝতে পারলেন আমার অস্বস্তি| সরে গেলেন | খাতাটা জমা নেওয়ার সময়ে স্যার আমার পিঠে হাত রেখে বললেন, “ ভারী সুন্দর লিখিস তো তুই | ” রচনাতে নম্বর কত পেয়েছিলাম মনে নেই, কিন্তু সেদিন স্যারের ওই কথা শুনে আমার চোখে জল এসেছিলো, নতুন বৌদি| ”
ও আমার হাতটা চেপে ধরলো | বললো, “ তারপর ? ”
“ একটু লিখেছি | স্কুলে দুজন ভীষণ ভালো বন্ধু ছিল | লুকিয়ে লুকিয়ে ওদের কে আমার লেখা পড়াতাম | জানি, অত্যন্তঅপরিনত লেখা, কোনো অর্থবাহী লেখাই নয়, কিন্তু আমার দুই বন্ধুর খুব ভালো লাগতো পড়তে,অন্ততঃ ওরা তাই বলতো আমায় | স্কুলে পৌছালেই জিজ্ঞাসা করতো, লেখা কই রে ? ভারী ভালোলাগতো তখন | ”
“ বাড়ির কেউ জানেন তুমি লেখো? ”
“ না ”
“ আমায় কাকিমা বলেছিলেন তোমার চিঠি নাকি piece of literature ? ”
আমি চুপ করেই ছিলাম |
“ ছাত্রজীবনে প্রেম করনি ? প্রেম করলে দেখতে লেখা আরো কত সুন্দর হত ! ” নতুন বৌদি বললো |
“ প্রেম করলাম কই ? ”
“ হাসলে যে ? ”
“ কিছু না, ভীষণ ছোট্ট একটা encounter, একটু ভালো লাগা, লাগতে না লাগতেই ছেড়ে যাওয়া – সেটা প্রেম ছিলনা | Just a collection of few innocent sweet moments | ”
“ লেখনি সেটা ? ”
“ চেষ্টা করেছিলাম | লিখতে গিয়ে শুধু গান আর গান মনে আসতো | গানের চোটে গল্প আর এগুচ্ছিলো কই ? কিন্তু, পরে দেখলাম, এতো মজা মন্দ নয় ? রবীন্দ্রনাথের গানের মতন এতসুন্দর ন্যাশনাল হাইওয়ে থাকলে আর চিন্তা কোথায় ? একটু স্টিয়ারিং টা ধরে রাখলেই গাড়ি এগিয়ে যাবে | ”
একটু থেমে বলছিলাম “ একটা অদ্ভুত ব্যাপার জানো, নতুন বৌদি ? যখন গাইতে বসি, তখন লেখা মনে হয়, যখন লিখতে বসি তখন খালি গান মনে হয় | কোনটাই হয়তো ঠিক করে পারিনা,সুর রাখলে তাল হারায়, আর লেখা ? জানিনা | আজ তুমি নিজের থেকে জিজ্ঞেস করলে, তাই এতগুলি কথা বললাম | কোনদিন তো কাউকে বলিনি | ”

“ ছোট ঠাকুরপো, তোমার জীবন তোশুরুই হয়নি এখনো | কত কিছু তোমার জন্য অপেক্ষা করে থাকবে – স্ত্রী, সন্তান, প্রতিষ্ঠা সব তুমি এক এক করেপাবে | আমার মতন বন্ধ্যাত্বের অভিশাপ বয়ে, মরুপথে হারিয়ে যাওয়া নদীর মতন থেমে যেতে হবে না ”
কত রাত অবধি গল্প করছিলাম | খোলা আকাশের নীচে একটু একটু ঠান্ডা লাগছিলো, নতুন বৌদি নাক টানছিলো, তাই ঘরে চলে এলাম | ও নিজের কথা বলছিলো | কখনো বলেনা | আমার কাছে বলে যদি একটু হালকা হয় | একটা কথা মনে ভীষণ বাজলো, “ মানুষ রয়ে গিয়েও কিরকম হারিয়ে যায়,তাই না ? ”
আমি ওকে নিজের একদম কাছে টেনে আমার বুকের মধ্যে ওকে জড়িয়ে ধরলাম | আজ সকালের প্রতিজ্ঞাটা রাখতে সারাদিন দূরে দূরেই ছিলাম | জোর করে, নিজের সাথে প্রত্যেক মুহুর্তে লড়াই করেই ছিলাম |
“ চিরনূতন, আর যেই হারিয়ে যাকনা কেন, তোমার জীবন থেকে আমি কোনদিন হারিয়ে যেতে পারবনা| যে তোমার কাছ থেকে হারিয়ে যাবে, সে নিজেরই সব কিছু হারাবে | ”
“ কেন – অর্থ, প্রতিষ্ঠা সব ই তো থাকবে | ”
“ থাকলেও সে হারাবে | হয়তো জানবেও না, কি হারিয়েছে | ”
ও আমার বুকের মধ্যে মাথাটা গুঁজে ছিল | আমার দিকে তাকিয়ে অভিমান ভরে বললো, “ আজসারাদিনে, সকালের পরে একবারও তো আমাকে কাছে টানোনি ? ”
“ জানি, নিজের প্রতিজ্ঞার সাথে নিজের লড়াই | ”
“ কিসের লড়াই ? ”
“ তুমি বিবাহিতা, আমারই মেজদার সাথে অঙ্গীকারবদ্ধ |সকালে ভেবেছিলাম, তোমার সাথে এভাবে নিজেকে লতায়, পাতায় জড়িয়ে রাখবনা | আর একদিকে তোমার সাথে ভালোবাসার স্রোতে বাঁধনহারা হয়ে খেলে বেড়াবারএকটা অদম্য বাসনা | লড়াইটা এই দুটোরই মধ্যে | ”
“ কার জিত চাও ? ” ও আমায় জিজ্ঞাসা করলো |
“ আমি কথায় বলতে পারছিনা, তুমি বুঝে নিতে পারবে না ? ”
“ তুমি যা চাইবে, তাই পাবে | জীবনে এই দুটো তিনটে দিন আমার মুক্তি, তারপর আমি বন্দী, বরাবরের মতন | তুমিও চলে যাবে | ”
“ পাবো ? ” ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করলাম | আমার সমস্ত মন, প্রাণ, শরীর কামনার উন্মাদনায় কাঁপছে |
ও চোখটা বন্ধ করে আমায় আরো জোরে নিজের সাথে আঁকড়ে নিলো|
কালকের পর আর একবার আমার ঠোঁটের সাথে ওর ঠোঁট মিলিয়ে দিলাম | আজ আমাদের নিঃশ্বাস গতকালের চেয়েও উত্তপ্ত, আরো ঘন ঘন পড়ছে | ভিতরের সেই ধক ধক | আজ যেন দামামার মতন বেজে চলেছে | এ বন্ধ হবার নয়|
ওর হাতটা আমার বুকের মধ্যে চেপে রেখে ফিসফিস করে বললাম, “ বুঝতে পারছো ? ”
“ পারছি, সব পারছি | ” বলে জোরেজোরে ওর মাথাটা আমার বুকের সাথে ঘষতে থাকলো |
“ লিপি! কি করছো আমায় ? ”
“ আমি সব দিতে রাজী | ”
প্রেমের কত রূপ আছে ! কখনো শান্ত, স্নিগ্ধ, মধুর, কখনো বা সে উত্তপ্ত, দুরন্ত – যেন ঘুর্নির মতো করে ধেয়ে আসে | সব উড়িয়ে নিয়ে যায়, বৈশাখী ঝড়ের মতন বেড়া ভেঙ্গে উদ্দাম উল্লাসে সে আসে | প্রকৃতির সাথে মানুষের চাওয়া পাওয়ার ও যে এতটাই সাদৃশ্য, সে রাতের আগে জানতামনা | সে জন্যই বুঝি প্রকৃতির সবটুকু উজাড় করে ঢেলে দেওয়া আছে নারীর শরীরে?
ঝড় আসবার জন্য কত প্রতীক্ষা| তাই তো আমরা ঝড়কে বরণ করি বারবার | নইলে গাই কেন, “ ঝড় কে পেলেম সাথী? ” আবার,
“ ঝড় কে আমি করবো মিতে, ডরব নাতার ভ্রূকুটিতে –
দাও ছেড়ে দাও, ওগো, আমি তুফানপেলে বাঁচি || ” আরো,
“ ওরে ঝড় নেমে আয়, আয় রে আমার শুকনো পাতার ডালে ”
ঘরে আবছা আলো, সেখানে তখনো যেন ঝড় বয়ে চলেছে | দুই অনাবৃত শরীরকে একসঙ্গে আড়ালকরে রাখার জন্য যে সাদা চাদরছিল, সেটাও উড়ে যেতে চাইছে স্পর্শে স্পর্শে আবিষ্কারের নেশায়, পরিপূর্ণপরিচয়টুকুর অপেক্ষায় আর উন্মাদনায় | প্রতিটি মুহূর্ত এগোচ্ছে, ছন্দে ছন্দে তালে তালে পূর্ণতা পাচ্ছে মিলনের লগ্ন, আরো যেনচাই, আরো, আরো | ঝড়ের সাথে সাথে যেন দেখতে পাচ্ছি বিদ্যুতের ঝলকানি | ভালোলাগায়, ভালোবাসায় লিপি চোখটাকে বন্ধ করে ফেলেছে | এবার বোধ হয় বৃষ্টি আসছে | কঠিনতা আর কোমলতার মেলবন্ধনগলে বয়ে চলেছে স্রোতের ধারা|
সে ঝড় এক সময়তে থেমে গেছে | ফিরে এসেছে প্রেমের স্নিগ্ধতা | ঘরে চাঁদের আলো ঢুকেছিলো | তাতেও ওর লজ্জা | চাদরটা দিয়ে আবার আমাদের ঢেকে নিয়েছিলাম, ওকে আড়াল করতে |

শেষ পর্ব
ওই তিনটে দিন কেটেছিলো স্বপ্নের মতন | তারপর ফিরে আসি বোম্বেতে | বিদায় নেবার দিনটিও চলে এলো | আমি বম্বেরপাততাড়ি গুটিয়ে চলে গেলাম ব্যাঙ্গালোরে | প্রতিদিন কিছু কিছু করে নতুন নতুন কথা, নতুন নতুন গল্প নতুন বৌদির জন্য জমিয়ে রাখতাম | চিঠি লিখতাম, কিছুদিন পরপর ওর উত্তরও পেতাম, তবে ওর খুব চিঠি লিখবার অভ্যাস ছিলনা | অনেক কথা, ভেবেছিলাম সেগুলি গিয়ে বলবো | মার্চ মাসে দলেরসময়ে যাবো ভেবেছিলাম, আমার টিকিট ও কাটা ছিল |
কিছুদিন ধরে আমার জেঠুর শরীর ভালো যাচ্ছিলনা | মনের মধ্যে একটা আশংকা ছিল, কোনো দুঃসংবাদ না পাই | একদিন অফিসে মা ’ র ফোন পাই | মা ’ র গলা শুনে ভয় হলো, সে আশঙ্কাটাই বুঝি সত্যি হলো | মা যখন বললো, “ না রে, মল্লিকা,… ” আমার তখন বিশ্বব্রহ্মান্ডের সব কিছু নিমেষের মধ্যে যেন ধংস হয়ে গেলো, নিজে বিধ্বস্ত হয়ে চূরমার হয়ে গেলাম | কেন এই শাস্তি পেয়েছিলাম ? মাত্র তিনদিনের প্রবল জ্বর, বেহুঁশ, ডাক্তাররা বোঝার আগেই সব শেষ | মেজদা তখন নেদারল্যান্ডে | খবর দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু মেজদা এসে পৌছবার আগেই নতুন বৌদি চিরবিদায় নেয় | চলে যাবার আগের দিন সন্ধ্যায় জ্বরের ঘোরে একবার ওর মাকে নাকি বলেছিলো, “ একবার ছোট ঠাকুরপোকে একটু ডেকে দেবে ? ”
অল্প কয়েক মাস পর জেঠুও চলে যান | এই শোক তিনি নিতে পারেননি অসুস্থ শরীরে |
নতুন বৌদির চলে যাওয়ার দুঃখের চেয়েও নির্মম দুঃখ পেয়েছিলাম আর একদিন | মেজদা দ্বিতীয়বার বিয়ে করে বছরখানেক পর | মেজদা উন্নতির আরো ধাপ পেরিয়ে মধ্য প্রাচ্যে চলে গেছে আর এক বিদেশী কোম্পানির ভাইস প্রেসিডেন্ট হয়ে | বাড়িতে ছোটখাটো একটা অনুষ্ঠান হয়েছিল মেজদার দ্বিতীয় বিয়ে উপলক্ষে, আমি আসিনি | যেদিন আমি আসি, সেদিন মেজদা তার দ্বিতীয়া স্ত্রী কে নিয়ে ফিরে যাচ্ছে gulf এ | জেঠিমা আশীর্বাদ করলেন এবারযেন তাদের সংসারে সন্তান আসে |
মল্লিকার চলে যাওয়ার জন্যই যেন ছিল ওদের নির্মম প্রতীক্ষা | হ্যা আশীর্বাদ নিশ্চয়ই মিলেছে | মেজদার একটি ছেলে, একটি মেয়ে |
আজ আমার আর শোক নেই | চোখের জলও শুকিয়ে গেছে | কখনো বা বর্ষণসিক্ত সকালে আবার সে অশ্রু ফিরে আসে যখন ওর কথা মনে করে গাই –
বন্ধু রহ রহ সাথে
আজি এ সঘন শ্রাবনপ্রাতে
ছিলে কি মোর স্বপনে সাথীহারা রাতে ||
নতুন বৌদি বলেছিলো কেউ রয়ে গিয়েও হারিয়ে যায় | আমার কাছে ও হারিয়ে গিয়েও রয়ে গেছে |
– সমাপ্ত –

Bangla Choti বাংলা চটি © 2016